আলেমদের জন্য মাওলানা খেতাব ব্যবহার করা

94

ভারত উপমহাদেশে বিশেষ করে পাকিস্তান, ভরত ও বাংলাদেশে মাওলানা শব্দের প্রচলন বেশি। যারা মাদরাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা মনে করে যে মাওলানা খেতাব প্রয়োগ না করলে সম্ভবত তাদের মান কমে যাবে বা নিজস্ব শিক্ষা এবং মর্যাদার সঠিক মূল্যায়ন করা হবে না। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বিশ্বের মুসলিম দেশ সমূহের অনেক দেশ আছে, যেখানে মাওলানা কি জিনিস তারা আদৌ বুঝে না। মাওলানা শব্দ একটি উর্দু শব্দ, যা অর্থের দিক দিয়ে বন্ধু, সঙ্গী, সাহায্যকারী ইত্যাদিকে বুঝায়। কুর’আন শরিফে মাওলা শব্দ আছে। ‘মাওলা’ শব্দের সাথে সমগ্র পৃথিবীর জড়িত থাকলেও ‘মাওলানা’ শব্দের সাথে প্রায় দেশই পরিচিত নেই। সাধারণ তথ্যানুসারে ফতোয়া বিশারদকে মুফতি বলে, হাদিস বিশারদকে মুহাদ্দিস বলে, তাফসির বিশারদকে মুফাসসির বলে, তাহলে কোন বিশারদকে মাওলানা বলে?

আমরা একটু যদি খেয়াল করে দেখি, তাহলে সহজেই বুঝতে পারি যে, নবী-রসুল, সাহাবি, তাবেয়ী, তাঁবে-তাবেয়ী, পীর, গাউস, কুতুব, আউলিয়া, দরবেশ, কেউই মাওলানা উপাধি ব্যবহার করেননিতাহলে বর্তমানের শিক্ষা বিশারদ-গন মাওলানা উপাধি পেল কোত্থেকে?  ইংরেজদের কর্তৃক বাংলা বিজয় এবং পরবর্তীতে সমগ্র ভারত উপমহাদেশ তাদের করতলগত হওয়ার পরে এই দেশের জনগণের দাবির মুখে ১৭৮০ সনে তারা প্রথম একটা আলিয়া মাদ্রাসার অনুমোদন দেয়; যদিও হিন্দুদের জন্য স্কুল অনুমোদন দেয় ১৭৮৪ সনে। তদানীন্তন ভারত উপমহাদেশের ৯৫% কর্মকর্তা-কর্মচারী হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও স্কুলের যায়গায় আলিয়া মাদ্রাসার অনুমোদন দেয়া ছিল ইংরেজদের জন্য এক পরিকল্পিত রহস্য। নিজামিয়া নেসাবের (কউমী মাদ্রাসার) সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলনই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

যাহোক ইতিপূর্বে শুধুমাত্র নিজামিয় শিক্ষা পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোন শিক্ষা প্রচলিত ছিল না। সেই আলোকে সরকারিভাবে নিজামিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়মেই ১৭৮০ থেকে ১৭৯০ সন পর্যন্ত ১০ বৎসর আলিয়া মাদ্রাসা চলে। তার পর থেকেই শুরু হয় আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ফলে তারা ১৮৫০ সাল থেকেই আলিয়া মাদ্রাসায় খৃষ্টান প্রিন্সিপাল নিয়োগ দিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ১৯২৭ সনের পূর্বে সেখানে কোন মুসলমান ব্যক্তিকে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তাদের ক্ষমতায়ন অবস্থায় তারা এই দেশের শিক্ষিত মুসলমানকে খান বাহাদুর, রাইসুল উলামা, সামসুল উলামা, সি এস পি ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করেন। ইতিহাস খুঁজে ১৯৩৬ সনের পূর্বে কোন ব্যক্তির নামের পূর্বে মাওলানা উপাধি ব্যবহার দেখা যায় না। মোট কথা ইংরেজদের সময়ই প্রথম মাওলানা শব্দের প্রচলন শুরু হয়। তবে উর্দু ভাষা থেকে মৌলভী (জ্ঞানী ব্যক্তি) উপাধিটি সকল আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষিত ব্যক্তিদের নামের পাশে উপাধি হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে। যেমন এই কে ফজলুল হকও মৌলভী ছিলেন। তারও পূর্বে যারা মোটা মুটি পড়া-লেখা জানত, তাদের নামের পূর্বে ‘মুন্সি’ ব্যবহার হতে থাকে। তখন লেখা পড়া জানা লোকের প্রচুর অভাব থাকাতে এই মুন্সি সম্প্রদায়ই প্রায় সকল সরকারী-বেসরকারি অফিসের এবং সমাজের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করত। এখনও পুলিশ, বি.জি.বি, সেনাবাহিনীর কিছু প্রতিষ্ঠানে সে মুন্সি শব্দের প্রচলন আছে। বর্তমানে কেরানী যে কাজ করে, তখন মুন্সিও সে কাজ করত।

যাহোক আমরা একটা বিষয় চিন্তা করতে পারি, তাহলো বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম বিস্তারের অগ্রদূত হিসাবে যাকে ইতিহাস জানে, সে আব্দুল কাদের জিলানী (র:)এর নামের পূর্বেও মাওলানা লেখা নেইএমনকি বাংলাদেশকে বার আউলিয়ার দেশ বলা হলেও কোন আউলিয়ার নামের পূর্বেই মাওলানা লেখা নেইতাহলে বর্তমানের শিক্ষা বিশারদরা এই মাওলানা উপাধি সৃষ্টি করল কোত্থেকে?  তাছাড়া পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখা এবং ভি ডি ও আমি ইন্টারনেটে দেখেছি, যাদের কারো নামের পূর্বেই মাওলানা শব্দ লেখা নেই। অনেক দেশের আলেম-গন মাওলানা কি জিনিস, তাই বুঝে না। অতএব মাওলানা কোন ডিগ্রীও না বা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদেয় কোন উপাধিও না। কাজেই যারা মাওলানা উপাধি নিয়ে খুব বেশি বড়াই করেন, তাদেরকে বলছি যে, প্লীজ আপনাদের ‘হামবড়া’ এই বাহাদুরি বন্ধ করুন এবং বেশি বেশি করে কিতাব অধ্যয়ন করে তা জনগণের মধ্যে প্রচার করুন। নিজে তা প্রথমে আমল করুন, এবং পরে তা অপরকে আমল করার জন্য বলুন। শুধুমাত্র নিজে সূর করে বক্তৃতা দিয়ে মানুষের মধ্যে নাম কামাই করবেন না এবং নিজে আমল ছেড়ে দিয়ে অন্যকে তা করতে বলবেন না। প্রত্যেকেরই জীবন-যাপনের জন্য রুজি উপার্জন দরকার আছে। তাই বলে ধর্মের বিষয়কে বিকিয়ে দিয়ে রুজি উপার্জন করা ইসলাম মোটেও সমর্থন করে না। ধর্মের যে বিষয়ে সন্দেহ আছে, বা বিভিন্ন মনিষী-গন বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে আপনাদের দ্বারা বাড়াবাড়ি না করাই হল সবথেকে উত্তম ব্যবস্থা। ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের সাইটে বিশ্বের ২৪৩৯ জন আলেমের নাম আছে, যাদের মধ্যে ভারত উপমহাদেশেরও অনেকেরই নাম আছে।

http://www.islamhouse.com/pg/9739/auther/1

দেখুন-তো সেখানে একজন আলেমের নামের পূর্বেও ‘মাওলানা’ বা ‘মোঃ’ লেখা আছে কি-না?  তাই আমার বলতে ইচ্ছে করে-

এলেম তাকে নিবে জান্নাতে পরোয়া নাহি করে,

আমল যাহার চলমান ছিল দুপুর সন্ধ্যা ভোরে।

সে ধরনের যোগ্য আলেম তুমি যদি হতে চাও,

সনদাহংকার ভুলে গিয়ে গন সারিতে মিশে যাও।

ডিগ্রী তুমি পাবে জান্নাতে করলে আমল ভবে,

তাছাড়া তোমার এলেম  তোমায় জাহান্নামে নিবে।

 

নামের পূর্বে যেকোনো খেতাব ব্যবহার করার সময় চিন্তা করতে হবে যে, সেই বিষয়টি আদৌ আন্তর্জাতিক সমর্থিত শব্দ কিনা। সাধারণত তিন প্রকারের খেতাব ছাড়া কোন প্রকার খেতাবই নামের পূর্বে ব্যবহার করা উচিত নয়।

১। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত যে কোন সামরিক পদবি। যেমন: উইং কমান্ডার, ক্যাপ্টেন, মেজর, জেনারেল, সার্জেন্ট ইত্যাদি। সেখানে কোন অবস্থায়ই বেসামরিক পদবি এমন কি পুলিশ বাহিনীর পদবীও নামের পূর্বে ব্যবহার করা হয় না, কারণ: বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনীর জন্য বিভিন্ন প্রকারের পদবি ব্যবহার করা হয়।

২। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত যে কোন গবেষণা বা শিক্ষালব্ধ উপাধি, পদবি এবং পেশা। যেমন: ডক্টর, প্রফেসর, প্রিন্সিপাল, ব্যারিস্টার ইত্যাদি।

৩। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত যে কোন ধর্মীয় উপাধি। যেমন: মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ক্কারী, হাফেজ ইত্যাদি। মাওলানা শব্দটি ধর্মীয় উপাধি মনে করা হলেও একমাত্র ভারত উপমহাদেশের কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন দেশে মাওলানা শব্দের ব্যবহার নেই এবং অনেক দেশ আছে, যারা মাওলানা কি জিনিস, তা নিজেরাই জানে না। কাজেই ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই মাওলানা শব্দ ব্যবহার করতে হবে, এটা একটা ভুল ধারনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে যে কোন জাতীয় পর্যায়ের সনদ তথা উপাধি নামের শেষে ব্যবহার করাতে দোষের কিছু নেই। যেমন: এম.এ , বি.এস.সি, বি.এড, মাস্টার, মেম্বার, চেয়ারম্যান, বীরপ্রতীক, ফাজিল, টাইটেল, ইত্যাদি। বাংলা ভাষার ব্যাকরণের নিয়মানুসারে অনুসর্গ ও উপসর্গের মধ্যে পার্থক্য না বুঝলে তার দ্বারা যে কোন শব্দ পূর্ব বা পরে ব্যবহারে কতটুকু পার্থক্য হয়, তা বুঝা সম্ভব নয়। অতএব যারা এই ধরনের শব্দ তথা মাওলানা শব্দ ব্যবহার করেন, তাদের উচিৎ মাওলানা শব্দটি নামের পূর্বে ব্যবহার না করে বরং আপনি যে সনদ অর্জন করেছেন, তা আপনার নামের পরে ব্যবহার করুন। যেমন: আসগর আলী টাইটেল / কামেল / বি.. ইত্যাদি। এখানে আরও একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, তাহলো গ্র্যাজুয়েশনের পূর্বে কোন সাধারণ ব্যক্তি দেশের একজন প্রথম শ্রেণীর নাগরিকই হতে পারে না, (কেবল সরকারী চাকুরীর পদবী এবং পদাধিকার বলে হতে পারে) কাজেই গ্র্যাজুয়েট এবং সমমানের নীচে যে কোন শিক্ষা সনদ প্রাপ্ত কোন ব্যক্তির নামের পূর্বে বা পরে কোন উপাধিই ব্যবহার করা উচিত নয়।

যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islamhouse.com/pg/9739/auther/1 

You may also like...