ইবাদত এবং দোয়া, তাসবীহ ও জিকিরের পার্থক্য না বুঝা

এই ক্ষেত্রে আমরা এই ভাবে একটা উদাহরণ টানতে পারি যে, একটি জমিতে আবাদ করা অর্থই হল সে জমিতে চাষ করা, বীজ বপন, সার দেয়া, বিষ ছিটান, আগাছা পরিস্কার ইত্যাদি। এখানে যেমন সকল উপকরণ গুলো আবাদেরই অংশ, তদ্রূপ দোয়া, তাসবীহ এবং জিকিরও ইবাদতেরই অংশ। ইবাদতটা হল ধর্মীয় সবগুলো বিষয়ের সারাংশ শব্দ। একই শব্দ বা বাক্য অনেক সময় দোয়া, তাসবিহ বা জিকিরে রূপ নেয়। কালেমা পড়ার সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হল দোয়া, তাসবিহে ফাতেমীর সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তাসবিহ এবং একই বাক্য চলমান পড়ার সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির। সুতরাং বাক্য একটা হলেও বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়ের অর্থের রূপ পরিবর্তন হয়েছে।

প্রায় সকলেই মনে করে থাকেন যে, দোয়া মানেই হল হাত তুলে মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন এর কাছে কিছু চাওয়া। আসলে তা নয়, যেমনঃ ভাত খাবেন সেখানে দোয়া আছে, অজু করবেন সেখানে দোয়া আছে, পায়খানা করবেন সেখানে দোয়া আছে, আজানের পরে দোয়া আছে। অর্থাৎ একজন মুসলমান ভোরে ঘুম থেকে উঠা হতে শুরু করে রাত্রে বিছানায় শুতে যাওয়ার মধ্যে যত কাজ করে থাকে, তার প্রত্যেকটিই হল ইবাদত, আর এইবাদত করতে যেয়ে মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন এর কাছে আরবী বা নিজের ভাষায় যে ভরসা করা হয়, হল দোয়া। সুতরাং দোয়া মানে হাত তুলে শুধু মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন এর কাছে কিছু চাওয়া নয়।

হাদিসের তথ্যানুসারে ‘দোয়া ইবাদতের মগজ’ বাক্যটির প্রচুর অপব্যখ্যা সমাজে বিদ্যমান। তাই আমাদের হানাফি মাজহাবে বেশির ভাগ আলেমই মনে করেন যে, নামাযই হল শুধুমাত্র ইবাদত, আর এখানে দোয়া না করলে ইবাদতের মগজ পাওয়া গেল না, তথা নামাজের কোন ফল হল না। প্রশ্ন হল যেহেতু মুসলমানদের সব কিছুই ইবাদত, তাহলে আমরা কি সকল অবস্থায়ই আল্লহর কাছে হাত তুলে দোয়া করি?  হাদিসের ভাষ্য অনুসারে মুসলমানদের সকল বিষয় ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও আপনারা সব যায়গায় এমনকি এস্তেঞ্জায় যাওয়ার পুর্ব মুহুর্তে হাত তুলে দোয়া করেননা কেন?  তাহলে কি একমাত্র নামাজ ছাড়া সকল বিষয়কে আপনারা ইবাদতের বাহিরে রাখতে চান?  অথচ আল্লহ রাব্বুল আলামীন সকল বিষয়কে ইবাদত হিসাবে গন্য করেছেন এবং তার বিনিময় মুল্য তিনি আমাদেরকে প্রদান করবেন। কখনও এই ধরনের মতবাদ প্রকাশ করে সুন্নতের বিরুদ্ধে মত পোষণ করবেন না।

হানাফি মাজহাবের সদস্য-গন যেমন বলেন যে, দোয়া ছাড়া গতি নেই, তেমনি আহলে হাদিসের সদস্য গন বলেন যে, হাত তুলে কোন অবস্থায়ই দোয়া করা যাবে না। এটা হল আরেক ধরনের গোঁড়ামি। সহীহ হাদিসে কি আসেনি যে, “যেই ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের ইমাম নিযুক্ত হল এবং সে শুধুমাত্র নিজের জন্য দোয়া করল, সে ইমাম তার সম্প্রদায়ের প্রতি খেয়ানত করল”। আমার প্রশ্ন হল তাহলে এই ক্ষেত্রে ইমাম কি হাত না তুলে দোয়া না করে বরং মাথা দিয়ে করবে? 

আমি ১৯৯৬ ইং সনে রংপুর জুম্মা-পাড়া মাদ্রাসায় মু’আল্লিম কোর্স করার সময় একজন আহলে হাদিসের আলেমের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তিনি তদানীন্তন আহলে হাদিসের চেয়ারম্যান ডঃ রাব্বি সাহেবের রেফারেন্স দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি বলেছেন, “যারা হাত তুলে দোয়া করে, তাদেরকে নিষেধ করার দরকার নেই। আর যারা দোয়া করে না, তাদেরকে হাত তুলে দোয়া করতে ব’ল না”। তখন আমার মনে হয়েছিল যে, উনার উত্তরটা নিতান্তই চেয়ারম্যান সুলভ, গোঁড়ামি সুলভ নয়। তবে এখানে একটা কথা বলে রাখা উচিৎ যে, জামায়াতে ফরজ নামাজ আদায় করার পর নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত তুলে দোয়া করেছেন, এই ধরনের কোন হাদিস অদ্যাবধি কোন হাদিস বিশারদ প্রমাণ করতে পারেননি।

আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা কোন অনুষ্ঠানের উপলক্ষে বাড়িতে কিছু মেহমান বা মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে দাওয়াত করে খাওয়ায়। সে সকল ক্ষেত্রে যদি কখনও খানা খানেওয়ালা ব্যক্তি-গন খানা শেষে খানার দাওয়াত প্রদান করনে ওয়ালা ব্যক্তি বা তার পরিবারের জন্য দোয়া না করে, তাহলে সে নাখোশ হয়ে যায়। রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিয়তের উপর কর্মফল নির্ভরশীল”। তিনি কিন্তু বলেননি যে দোয়ায়ের উপর কর্মফল নির্ভরশীল। অতএব আপনি যখন কাউকে খাওয়ানোর নিয়ত করবেন, যদি তা কবুল হওয়ার মতন হয়, তাহলে সাথে সাথে কবুল হয়ে যাবে। সেখানে নতুন করে দোয়া করতে হবে না। তাই আপনাদের প্রতি অনুরোধ হল, যদি কোন মানুষকে খাওয়ানোর জন্য দাওয়াত করেন, তাহলে তাদেরকে দিয়ে দোয়া করিয়ে নিবেন না। কারণ মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন নিয়তের উপর গুরুত্ব দেন, দোয়ার ঊপর নয়।

অতএব, আমরা বলতে পারি যে, একজন মুসলমান ইসলামের আলোকে যা কিছু করেন, তাই তাঁর জন্য ইবাদত। আর ভিন্ন ভিন্ন ইবাদতের মধ্যে আল্লহর উদ্দেশ্য যা কিছু বলা হয়, তাই দোয়া। আরও পরিষ্কার করে এই ভাবে বলা যায় যে, ‘কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ইবাদতের লক্ষ্যে মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন এর উপর সন্তুষ্টি ও সাহায্য কামনার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট শব্দ অথবা বাক্যের সমন্বয়ে গঠিত অর্থবোধক শব্দ সম্ভারকে বলা হয় সে বিষয়ের দোয়া’। যেমনঃ অজুর দোয়া, গোসলের দোয়া, জায়নামাজের দোয়া, খানা শুরু করার দোয়া, এই স্তেঞ্জার দোয়া, নতুন কাপড় পরার দোয়া ইত্যাদি। কাজেই হাত উঠানোকে দোয়া বলা ঠিক না। আমরা যাকে শুধুমাত্র দোয়া বলে জানি, তা আসলে দোয়া নয়, বরং হাত তুলে কোন কিছু চাওয়াকে বলে মোনাজাত বা কামনা। আর মোনাজাতের মধ্যে মানুষ যা কিছু আল্লহর উদ্দেশ্যে বলে, তাকেই বলে মোনাজাতের দোয়া। কোন বাক্য বা শব্দ একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বার বলা হলে তাকে বলে তাসবিহ। আর কোন বাক্য বা শব্দ বে-হিসাবি ভাবে বা বার-বার বলা হলে তাকে সাধারণ পরিভাষায় বলা হয় জিকির। তবে সামগ্রিক ভাবে মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন এর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যা কিছু করা হয়, তার সব কিছুকেই জিকির বলা হয়। অতএব একথা কখনো মনে করবেন না যে, নামাজের পরে অথবা অন্য যে কোন সময়ে কোন প্রয়োজনের জন্য হাত তুলে আরবি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় কিছু চাওয়াটাই শুধুমাত্র দোয়া, বাদ বাকি অন্য কিছুই দোয়া নয়।

http://www.islamicity.com/qa/action.lasso.asp? -db=services&-lay=Ask&-op=eq&number=1417&-format=detailpop.shtml&-find

http://www.islam-qa.com/en/ref/145112/tasbih

http://en.allexperts.com/q/Islam-West-3901/2010/7/islam-1.htm

http://www.islam-qa.com/en/ref/21976/tasbih

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *