কুরবানির মাংস তিন ভাগ করা বাধ্যতামূলক মনে করা

88.2

বাৎসরিক কুরবানির মাস আসার আগেই শুরু হয়ে যায় কুরবানির মাংস বণ্টন সংক্রান্ত কিছু সামাজিক চিরা-চরিত প্রথা। তাহলো, কোন্‌ ব্যক্তি মসজিদের চাঁদা দেয়নি অথবা গ্রাম্য প্রধানদের কোন্‌ কথা অমান্য করেছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যখন কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়, তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, অমুক ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বাদ দাও অথবা অমুক ব্যক্তিকে কুরবানির মাংস দেয়া উচিৎ না ইত্যাদি। অবশ্য এই ছাড়া সারা বছর সমাজের তেমন কোন প্রয়োজন দেখা দেয় না। অবশ্য কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি যদি একই দোষ করে, তাহলে গরীব মানুষদের কিন্তু সেখানে কথা বলার মত তেমন কোন ভূমিকা থাকেনা। নিতান্তই কোন গরীব মানুষ যদি তাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়েতে সে এলাকার অর্থ-শালী ব্যক্তিদেরকে এক মুঠ খাওয়ানোর জন্য দাওয়াত দিতে না পারে, তাহলে এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, সে গরীব ব্যক্তির পক্ষে সে সমাজে থাকা তথা সে বৎসরের কুরবানির মাংসের ভাগ পাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তাই গরীবদের প্রতি প্রতিশোধের জন্য কুরবানি একটি বিশেষ সময়।

ধর্মীয় নিয়মানুসারে কুরবানির মাসে যারা নিসাব পরিমাণ মালের মালিক থাকবে, তাদের জন্য সে বৎসর কুরবানি দেয়া ওয়াজিব। কুরবানির মাংস কিভাবে বণ্টন করতে হবে, তা কুর-আন হাদিসের কোন যায়গায় সরাসরি অনুপাত নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। উভয় নীতিমালায়ই আদেশ হল, “ তোমরা নিজেরা খাও, আত্মীয়- স্বজনকে দাও এবং ফকির-মিসকিনকে দান কর”। এর উপর নির্ভর করে আমাদের মাওলানা সাহেব-গন বিধান জারী করেছেন যে, “সকল মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজে রাখ, এক ভাগ আত্মীয়দেরকে দাও এবং এক ভাগ গরিবদেরকে দান কর”। আলেমদের বর্ণিত বিধানেও সামাজিক ভাগ বলতে কোন কথা নেই। অথচ এই সামাজিক ভাগই কিন্তু ধনীদের পক্ষ থেকে গরীবদের প্রতি চাপ সৃষ্টি করার এক বৃহত্তম মাধ্যম। কারণ: গরীবরা ধনীদের কথার কোন প্রকার অবাধ্য হলেই তার শাস্তি ভোগ করতে হবে বৎসরে কমপক্ষে একবার, আর তা হল কুরবানির সময়।

বৈধ পদ্ধতিতে জবেহ করা পশুর মাংস স্বাভাবিক ভাবে সবার জন্যই হালাল। তবে অনেক ক্ষেত্রেই একই বস্তু কারো জন্য হালাল, আবার কারো জন্য হারাম। কুরবানির মাংসের মধ্যেও এমন একটি অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে, যা সম্পর্কে কুরবানি দাতা-গন একেবারেই উদাসীন। প্রশ্ন থাকে যে, যে ভাগটি সমাজে রেখে আসা হয়, সেটি কার অংশ?  যদি উত্তর হয় ‘মিসকিনের অংশ’, তাহলে সে মাংস সকল প্রকার মিসকিনদের জন্য হালাল, আর কুরবানি দাতাদের জন্য হারাম; অথচ হারাম হওয়া সত্ত্বেও সে মাংসই আবার সমাজ থেকে ভাগ করে নিয়ে এই সে নিজেদের পরিবার-পরিজনকে নিয়ে কুরবানি দাতা-গন খাচ্ছে। পক্ষান্তরে যদি উত্তর হয় যে, ‘রেখে আসা ভাগটি আত্মীয়-স্বজনের’, তাহলে নিশ্চয়ই মিসকিনদের আর নিজের অংশ মিলিয়ে দুই অংশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। আর সেমতাবস্থায় নির্দ্বিধায় মিসকিনদের জন্য নির্ধারিত মাংসের অংশ কুরবানি দাতাদের জন্য হারাম হবে। এই সকল বিষয়ে আলেম সমাজের দ্বারা কোন সিদ্ধান্ত প্রদানের পূর্বে আমাদের দেশের মানুষের লোভের কথা চিন্তা করে তিন ভাগ পদ্ধতি প্রথা জারী করা উচিৎ ছিল। বর্তমানে একমাত্র শহরের মানুষই এই তিন ভাগ পদ্ধতি থেকে বাহিরে আছে। কাজেই তাদের উপার্জন যদি হালাল হয়, তাহলে কেবল তারাই কুরবানির হালাল মাংসের সাথে হারাম মিশ্রণ থেকে বিরত থাকতে পারে।

অথচ এই মাংসই যদি ভাগ পদ্ধতির মধ্যে না যেয়ে পুরোটাই কুরবানি দাতা খেয়ে ফেলে অথবা আত্মীয়-স্বজন বা ফকির-মিসকিনকে দান করে দেয়, তাহলে হারাম হওয়ার মত কিছু থাকেনা। মনে রাখতে হবে যে, যে কোন হালাল খাদ্যই যদি সদকা বা মিসকিনদের অংশ হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়, তাহলে সে হালাল খাদ্য আর নেসাব পরিমাণ মালের মালিকদের জন্য হালাল থাকেনা। অর্থাৎ ঘোষণা হওয়া মাত্রই তা সাহেবে নিসাবদের জন্য হারাম হয়ে যায়। এই বিষয়ে স্থানীয় আলেমদের বিশেষভাবে দায়িত্ব হল, তাদের নেতৃত্বের সকল মুসুল্লিদেরকে বুঝানো উচিৎ যে, কুরবানির মাংসের তিনভাগ পদ্ধতি ইসলামে বর্ণিত কোন বিধান নয়, বরং এটা হল সময়ের কিছু আলেম-সম্প্রদায়, যারা দেশের লোভী মানুষদেরকে নিয়ে ভবিষ্যৎয়ের কুফল সম্বন্ধে চিন্তা করেননি, তাদের একটা ধারনা মাত্র।

মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন কুরবানির মাংস বা রক্ত কিছুই গ্রহণ করেননা, বরং ব্যক্তির নিয়তকেই গ্রহণ করেন। আমাদের দেশে কুরবানির মাস আসার পূর্বেই সকল কোম্পানি তাদের ফ্রিজ জাত পণ্যের উপর ছাড় দেয়। যাতে করে কুরবানি দাতা-গন গরিবদের হক আত্মসাৎ করে তাদের অনেক সহজার্জিত সম্পদ দ্বারা কেনা কুরবানির পশুর মাংসগুলো বেশি দিন ধরে নাক-মুখ চুবিয়ে খেতে পারে। আমাদের দেশের এই সকল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদেরকে দৃষ্টি দেয়া উচিৎ মিডল ইস্টয়ের মুসলমানদের প্রতি, যারা তাদের অর্জিত সম্পদ দ্বারা কেনা পশু কুরবানি করে আমাদের দেশের মত অনেক দেশের গরিব মানুষদের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়। আপনার পছন্দের কুরবানির পশুর মাংসের লোভ ত্যাগ করে সর্বোচ্চ তিন দিনে যা খেতে পারবেন, তাই রেখে বাকি সকল মাংস গরীবদেরকে দান করুন। যদি তার পরে আপনার মাংসের দরকার পরে, তাহলে আপনার অর্জিত অর্থ দিয়ে আবার বাজার থেকে কিনে নিন সে সম্পদ দিয়ে, যে ক্ষমতা আল্লহ আপনাকে দিয়েছেন। অতএব ভাবতে শিখুন যে, ‘ভোগে সুখ নেই বরং ত্যাগেই সুখ’। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://en.allexperts.com/q/Islam-947/2011/10/sacrifice-1.htm 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *