কোন আলেম কর্তৃক অন্যকে অজ্ঞ মনে করা বা হেয় ভাবা

112.2

আলেম অর্থ হল জ্ঞানী। এর মানে এই নয় যে, যেই ব্যক্তি আরবি, উর্দু অথবা ফারসি বিষয়ে লেখা-পড়া করে বড় বড় ডিগ্রী নিয়েছে, তাকেই বলা হয় আলেম। যে ব্যক্তির মধ্যে এলেম আছে; তা যেভাবেই গ্রহণ করা বা শিক্ষা করা হোক না কেন, তাকেই বলা যাবে আলেম। এলেম অর্জন করার সবথেকে বড় এবং শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম হল পড়া। যার ফলে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের জন্য পাক কালামের সর্বপ্রথম শব্দ হিসাবে নাজিল করেছেন “ইক্করা” অর্থ হল ‘পড়’। এই শব্দ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সকল ক্ষেত্রেই জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষকের দরকার নেই, যদি সেই ব্যক্তির দ্বারা কিতাব পড়ে নির্দিষ্ট বিষয়টি বুঝার মত ক্ষমতা থাকে। তবে কোন বিষয় সঠিকভাবে না বুঝতে পারলে অবশ্যই সেই বিষয়ে কোন জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট থেকে বুঝে নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে কোন প্রকার গোমরাহিই গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমানে যারা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করে, তাদের ধারনা হল, “কওমি মাদ্রাসার আলেমরা দুনিয়াবি বিষয়ের সাথে তাল মিলেয়ে তেমন কোন জ্ঞান রাখে না। অর্থাৎ সব অবস্থার সাথে তাল মেলানোর ক্ষমতা তাদের নেই। তারা শুধু আরবি ফারসি বড় বড় কিতার পড়া নিয়েই ব্যস্ত”। যারা কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরা পাশ করে তাদের ধারনা হল, “জেনারেল শিক্ষিত লোকরা ধর্ম বিষয়ে তেমন কিছুই জানে না। কারণ তারা ইংরেজদের  প্রবর্তিত শিক্ষার মাধ্যমে লেখা-পড়া করে থাকে। আর আলিয়া মাদ্রাসার আলেমরা পানির মত যে পাত্রে যায় সেই আকার ধারণ করে। তাদের আরবি, ফারসি বিষয়ে তেমন কোন জ্ঞান নেই। দুনিয়ার সবথেকে বড় বড় নামি-দামি কিতাবগুলো আরবি, ফারসি বা উর্দু ভাষায়ই লেখা। সুতরাং আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষিতরা শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাস করার জন্য যতটুকু পড়ার দরকার, কিতাব থেকে ঠিক ততটুকুই পাঠ করে থাকে। এর চেয়ে বেশি তার পড়ার চেষ্টা করে না। কারণ সেগুলো পড়লে তাদের নির্ধারিত সিলেবাসের বিষয়গুলোতে অধিক মনযোগী হওয়া সম্ভব না”। যারা জেনারেল শিক্ষায় ইসলামি শিক্ষার উপরে পাস করে , তাদের ধারনা হল, “আলিয়া অথবা কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত আলেম-গন যা-ই বলুক না কেন, আসলে পৃথিবীর অবস্থা যেমন প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল, ঠিক তেমনি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো ছাড়া সকল পরিবর্তনশীল বিষয়ে যুগের আলেমদের কর্তৃক পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত সকলকেই অনুসরণ করা উচিৎ”।

এর মধ্যে যে বিষয়টি মূলত: কাজ করে, তাহলো এক আলেম অন্য আলেমের সিদ্ধান্তকে বেশীরভাগ-ক্ষেত্রে দুর্বল মনে করে এবং সেক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তকেই সবথেকে গ্রহণযোগ্য হিসাবে মনে করে। অপরের মর্যাদা প্রদান করতে খুবই কার্পণ্য বোধ করে। অথচ সাহাবি (রাঃ) দেরকে যদি তাঁরা অনুসরণ করতেন, তাহলে কখনোই এরূপ করতে পারতেন না। কোন সাহাবি-ই নিজেকে অন্য সাহাবির উপরে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেননি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ‘ওয়ায়েস করনী’ কখনো রসুল সল্লাল্ল-হু আলাইহি সাল্লামকে দেখেননি বা সাহাবিও ছিলেন না। অথচ সেই ব্যক্তিই আল্লহর রসুলের জুব্বা পাওয়ার জন্য অধিকারী হয়েছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) কিন্তু  তাঁকে কখনো বলেননি যে, “তুমি রসুল সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখইনি, তাহলে তুমি আবার এলেমের কি জান”?  কারণ তাঁদের মধ্যে বর্তমান আলেমদের মত নিজেদেরকে জাহির করার মত এরূপ মনোভব ছিল না। তারা কখনোই মনে করতেন না যে, নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে কিছু না শিখলেই আর কোন প্রকার এলেম অর্জন করা সম্ভব না। বরং তারা মনে করতেন যে, যে ব্যক্তির যে ধরনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান আছে, তাকে সেই বিষয়ে প্রাধান্য দিয়ে বরং তার কাছে থেকে সেই বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিৎ।

আমাদের দেশের মধ্যে মাত্র ১০ জন্য মুফতি যদি বাছাই করা হয়, তার মধ্যেও থাকবে এমন একজন মুফতির নির্দিষ্ট সমাবেশের কিছু বক্তৃতা এমন, “এখানে যদি আলেম ছাড়া কোন ব্যক্তি থাকেন, তাহলে বের হয়ে যান”। তার কাছে জেনারেল শিক্ষিত লোকের সকল শিক্ষাই বৃথা। আমি বলতে চাই যে, যারা আল্লহর ইচ্ছায় আজকে ব্রয়লার মুরগীর আবিষ্কার করে দরিদ্র ব্যক্তিদেরকে মাংস খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, সকল প্রকার কার্প জাতীয় মাছের আবিষ্কার করে মাছের নিম্নতর চাহিদা পূরণ করেছেন, ইরি ধানের আবিষ্কার করে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মানুষের আহারের ব্যবস্থা করেছেন, একজনের রক্ত অন্যকে দিয়ে জীবন বাঁচানোর ব্যবস্থা করছেন, মৃত ব্যক্তির চোখ কেটে নিয়ে অন্ধ ব্যক্তির চোখে আলো দেখাচ্ছেন এমনকি পৃথিবীর প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে নতুন কিছু আবিষ্কার করছেন, তারা প্রত্যেকেই কিন্তু জেনারেল লাইনেই লেখা-পড়া শিখেছেন। কাজেই নিজে এই পৃথিবীতে এত বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজের আবিষ্কারের অংশী হয়েও যারা এক আল্লহর প্রতি বিশ্বাস করে তাঁকে সেজদা করে, মুফতি সাহেবরা তাদেরকে এত গুরুত্বহীন হিসাবে কেন দেখেন এবং হেয় মনে করেন, তা নিশ্চয়ই বোধগম্য নয়। তবে কোন জেনারেল শিক্ষিত লোকই নিজেকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের থেকে নিজেকে বড় মনে করে না। তারা সর্বাবস্থায়ই নিজেদেরকে নিজস্ব এলাকার ইমামের অনুসরণকারী হিসাবেই চালিয়ে নেয়। রসুল সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিরাও কোন মুশরিক, মুনাফিক এবং কাফের জ্ঞানী ব্যক্তিদেরকে এমনভাবে অবমূল্যায়িত করেননি; যেমন-ভাবে আমাদের সমাজের আলেমরা জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদেরকে ভেবে থাকেন। শিশু শিক্ষায় পড়েছিলাম, “যত তৎ মহৎ সৎ”। আলেমদের জানা উচিৎ যে, জেনারেল শিক্ষা গ্রহণ করা অনেক ব্যক্তিই স্বপ্ন-যোগে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দর্শন লাভ করেছেন, যা অনেক নামি- দামী আলেমের ভাগ্যেই জোটেনি। কাজেই ধর্মীয় দৃষ্টিতে আলেম তাকে বলে না, যে ব্যক্তি কোন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করে সনদ অর্জন করেছেন। বরং আলেম তাকে বলে, যে ব্যক্তি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় যে কোন মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করেছেন এবং সেই জ্ঞান নিজের আমলেও কাজে লাগিয়েছেন।

মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন পাক কালামে বলেছেন, “তোমরা তাদের দেব-দেবীদের গালি দিও না, তাহলে তারা হয়তো রাগের বশবর্তী হয়ে তোমার প্রভুকে গালি দিবে”। তাই এখানে থেকে আলেমদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ যে, অন্য ধর্মের দেবতার কোন সমালোচনা করাই যেখান উচিৎ নয়, সেখানে এক মুসলমান হয়ে অন্য মুসলমান ব্যক্তিকে কিভাবে এত হেয় প্রতিপন্ন করা যায়। পৃথিবীর সবথেকে হিংস্র প্রাণী হায়েনাও তার নিজের জাতের মাংস খায় না, অথচ আমাদের এক আলেম অন্য আলেমদেরই তেমন গুরুত্ব দেয় না। হানাফি মাজহাব সমর্থিত আলেম-গন আহলে হাদিস আলেমদেরকে মোটেও দাম দেয় না। অপরপক্ষে আহলে হাদিসের আলম-গন হানাফি মযহাবের আলেমদেরকে একেবারেই দাম দিতে চায় না; অথচ উভয় দলের মধ্যে ফরজ ওয়াজিব বিষয় নিয়ে কোন মতপার্থক্য নেই। যত মতপার্থক্য আছে, তার সবই প্রায় নফল আর কিছু আছে সুন্নত নিয়ে। আর এর ফলশ্রুতিতে সারা বিশ্বে এমনকি দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ বাংলাদেশেও এত মতাবলম্বীর মুসলমানের অবস্থান। অপরপক্ষে খৃষ্টান ধর্মের যে যেখানেই অবস্থান করুক সকল পোপ-ই রসুনের মত একই বৃন্তের অন্তর্ভুক্ত। অতএব আলেমরা যদি নিজেদের হামবড়া ভাব থেকে বেরিয়ে আসতে না পারেন তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত  অন্ধ বিশ্বাসী সাধারণ লোকদের দ্বারা সেই গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব না। মহান আল্লাহ সকল মুসলমান আলেমদেরকে এক মতের অনুসারী করে ইসলামকে শক্তিশালী করার তাওফিক দান করুন। আমিন। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লাহ-ই ভাল জানেন, তারপরও যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://islamqa.com/en/ref/49023/highest%20dignity

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *