জামায়াতে ফরজ নামাজের পর হাত তুলে দোয়া করা

মেশকাত শরীফের দোয়া অধ্যায়ের প্রথমেই লেখা আছে যে, “সাহাবী (রা:) কর্তৃক বর্ণিত এমন কোন হাদিস আজ পর্যন্তও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি যে, মহানবী সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাযে তথা জামায়াতে নামাজ আদায় করার পর হাত তুলে দোয়া করেছেন”। তবে তিনি কুসুফের নামাজ, খুসুফের নামাজ সহ অন্যান্য নামাজে দোয়া করেছেন, এই ধরনের তথ্য হাদিস কর্তৃক প্রমাণিত। যে এলাকায় থেকে ইসলামের উৎপত্তি, সেখানে কিন্তু আজও ফরজ নামাজে কোন প্রকার দোয় অনুষ্ঠিত হয়না। তবে মহানবী সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আমল-কৃত অনেক দোয়াই হাদিসে লিপিবদ্ধ আছে, সেগুলো সবই তিনি একক ভাবে আদায় করেছেন। তাই নফল নামাজের পর কেউ তার প্রয়োজনে দোয়া করবে, তাতে কোন নিষিদ্ধ নেই, বরং তাতে উৎসাহিত করে বলা হয়েছে যে, “তোমাদের এক জোড়া জুতার ফিতারও যদি দরকার হয়, তাহলে আল্লহ রব্বুল আলামীনের কাছে চাও”। অতএব এককভাবে দোয়া করাতে কোন সমস্যা নেই।

মনে করুন, ইমাম সাহেবের সাথে নামাজ পড়ার জন্য কেউ হয়ত জামাতের শেষর দিকে এই সে অংশ গ্রহণ করল। অতঃপর ইমাম সাহেব সালাম ফিরানোর পর যখন সে মুসুল্লি বাকি নামাজ পড়ার জন্য দাড়ায়, তখনই হয়ত ইমাম সাহেব মাইক্রোফোন সামনে লাগিয়ে দোয়া করা শুরু করে। দোয়ার বিভিন্ন বানী এবং কোর’আনের কিছু আয়াত-সমূহ এমন ভাবে তিলাওয়াত করেতে থাকে যে, বাদ পরা নামাজ আদায়-রত মুসল্লিদের জন্য তাদের নামাজের দিকে মনোযোগ না থাকারই কথা। দোয়া করাতে কোন সমস্যা নেই, সমস্যা হল সংঘবদ্ধভাবে ফরজ নামাজে দোয়ায় অংশ গ্রহণ করা। বাংলাদেশের অনেক আলেম শুধুমাত্র কোথাও চাকুরী করা তথা মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্যই দোয়া করে থাকে। কারণ তাঁরা জানেন যে, ফরজ নামাজ শেষে সংঘবদ্ধ ভাবে দোয়া করা সংক্রান্ত কোন হাদিস নেই। কিন্তু দোয়া না করলে সাধারণ ব্যক্তি-গন মনে করে যে, “দোয়া হল ইবাদতের মগজ”, তাহলে দোয়া ছাড়া নামাজ কি অসম্পূর্ণ থেকে গেল না?  দোয়ার বিষয় ইবাদত অধ্যায়ে আরও থাকবে। বুঝতে পাড়ার পর থেকে হাত তুলে দোয়া করে অভ্যস্ত থাকার ফলে দোয়া বিহীন অবস্থাকে আমরা সহজে কেউই মেনে নিতে পারি না। প্রকৃত পক্ষে ফরজ নামাজের পরে সবাই মিলে হাত তুলে দোয়া করা সম্পূর্ণরূপে বিদ্‌য়াত; যদিও আমাদের দেশের প্রায় সর্বত্রই দোয়া ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে, এবং আমরা এখনও করে যাচ্ছি।

তাই বলে দোয়া করা বা আল্লহ রব্বুল আলামীনের কাছে চাওয়া কিন্তু ছেড়ে দেয়া যাবে না। কারণ: দোয়া হল ইসলামের একটা বিশেষ ধর্মীয় বিধান। নিজের প্রতিটি প্রয়োজন এবং সমস্যায় আল্লহ রব্বুল আলামীনের কাছে চাওয়ার জন্য রসুল সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন; তবে সে দোয়াটি অবশ্যই হতে হবে একাকী। একটি হাদিসে আছে, “যেই ব্যক্তি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন এবং শেষ দিনে ঈমান রাখে, তার জন্য বৈধ নয় সম্মতি ভিন্ন কোন সম্প্রদায়ের ইমামত করা এবং তাদের বাদ দিয়ে কেবল নিজের জন্যই বিশেষ করে দোয়া করা। এমন যদি করে, তাহলে সে তাদের সাথে খেয়ানত করল”। ইমাম একাকী দোয়া করলেও পুরো সম্প্রদায়ের জন্য দোয়া করতে হবে এইজন্য যে, যখন ইমাম নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করেন, তখন অর্থের দিক দিয়ে তিনি তা একবচন হিসাবেই করেন। অথচ সকল মুক্তাদি তা নীরবে শ্রবণ করে এবং অবশেষে ইমামের সাথে একমত পোষণ করে আল্লহ রব্বুল আলামীনের কাছে ইমামের পক্ষে সবাই দাবি করে বলেন “আমিন”। সুতরাং সকল মুসুল্লি যেমন ইমামের পক্ষে আল্লহ রব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করেন, তদ্রূপ ইমামের জন্যও উচিৎ সকল এলাকাবাসীর জন্য দোয়া করা; যদিও তিনি একাকী অথবা নিজস্ব নামাজ আদায় করে থাকেন।

উদাহরণস্বরূপ মনে করুন প্রধান মন্ত্রী ঢাকাতে অবস্থান করছেন। এমতাবস্থায় আমি প্রধান মন্ত্রীর কাছে যদি হাত পেতে দশ টাকা চাই, তাহলে কখনোই আমার দ্বারা হাত পেতে তার কাছে থেকে টাকা নেওয়া সম্ভাবনা, কারণ তিনি আমার সামনে নেই। যে ব্যক্তি আমার সামনে আছে তার কাছে থেকেই কেবল হাত পেতে কিছু পাওয়া সম্ভব। অথচ আমি যদি সময় করে একটা আবেদন করি, তাহলে তিনি ঢাকা অবস্থান করলেও আমার সমস্যার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা অনুমোদন দিতে পারেন, যা আমি বাড়ি বসেই কোন না কোন মাধ্যমে পেয়ে যাব। অথচ যে ব্যক্তি আমার সামনে প্রকাশমান আছে, তার কাছে যদি দশ টাকা চাই, তাহলে সাথে সাথেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই আল্লহ যেহেতু গোপনে থাকেন, সে জন্য আমাদেরও তাঁর কাছে গোপনেই চাওয়া উচিৎ। মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ-ই আমাদের সবথেকে নিকটে বিরাজমান এবং তিনি আমাদের মনের সকল গোপন খবরও রাখেন। প্রকাশ্যে হাত তুলে চাওয়ার গুরুত্ব তখনই বিদ্যমান, যখন প্রকাশ্য বিনিময় হাতে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর আল্লহ প্রকাশ্য কিছুই দেন না, বরং তিনি দেন সব গোপনে এবং যে কোন একটি উছিলাকে মাধ্যম করে। অপর পক্ষে মুশরিক-গন তাদের নিজ হাতে তৈরি করা মূর্তি দেবতাকে কাছে দেখতে পায়। যার ফলে তার কাছে হাত কর-জোড় করে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস বা বিষয় চেয়ে থাকে। সব থেকে বড় বিষয় হল, যদি হাত তুলে দোয়া করার মধ্যে মোটেও কোন গুরুত্ব বা বরকত থাকত, তাহলে আরব দেশ সমূহের যারা তাদের পিতার দেখা-দেখি ইসলাম ধর্ম শিখেছে অথবা যাদের ধমনীতে সাহাবী (রা:) দের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তারাই সর্ব প্রথমে আমল করত।

সব থেকে বড় একটি কারণ হল ইমাম সাহেব আরবি ভাষায় তথা কুর’আন হাদিস থেকে যে সকল অংশ সংঘবদ্ধ দোয়ার মধ্যে বলে থাকেন, সেগুলোর সব অংশই এককভাবে কেবল ইমামের জন্যই। অর্থাৎ আমার, আমাকে, আমি, আমার পিতা-মাতা, আমার বংশ ইত্যাদি একবচন বা উত্তম পুরুষ জনিত বাক্য। এখানে শুধুমাত্র একটি শব্দ থাকে কমন-ভাবে, তাহলো মু’মিন বা মুসলমান। এটা ঠিক নয় যে, একজনে শুধু মাত্র সবার দাবি একসাথে বলে যাবে, আর সবাই হাত তুলে বসে শুধুমাত্র আমিন আমিন করবে। এটা পৃথিবীর রাজনৈতিক মঞ্চ নয় যে, সবাই গ্রামে বসে থাকবে, আর চেয়ারম্যান সাহেব সবার পক্ষ থেকে গম তুলে নিয়ে আসবেন এবং সবার মধ্যে বণ্টন করবেন। এখানে সমস্যা প্রত্যেকের আলাদা, চাওয়ার সামগ্রীও আলাদা, সবশেষে কবরও প্রত্যেকের জন্যই আলাদা। কাজেই আমার প্রয়োজন কখনোই ইমাম সাহেবকে দিয়ে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া মহান মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন আমাকে কথা বলার মত যে কোন একটি ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে আমি সবার সাথে তথ্যের আদান-প্রদান করে থাকি। অতএব যে সৃষ্টিকর্তা আমাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর কাছে আমার মনের কথাটা নিজে খুলে না বলে একজন ভাড়া করা ইমাম নিয়ে এই সে তাকে দিয়ে বলিয়ে নিব, নিঃসন্দেহে এটা মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনের দেয় ক্ষমতার না-শুকরিয়া আদায় ছাড়া কিছুই না। তবে কেউ যদি কারো অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করে, তাহলে তার কোন বিকল্পই নেই।

ধরে নেই কোন একজন মানুষ তার দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং সংসার পরিচালনা করতে যেয়ে কোন একদিন তার সংসারে একবেলা পাকানোর মত চাল নেই। সেক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি কি সবাইকে দেখিয়ে বা শুনিয়ে বলে বেড়ায় যে, “আমার ঘরে চাল নেই, তাই তোমরা আমাকে সাহায্য কর”, অবশ্যই না। সে ব্যক্তি প্রথমে তার অভাবটা নিজের সব থেকে কাছের বন্ধু বা আত্মীয়কে বলে সমাধা করার চেষ্টা করে। সেখানে না হলে নিজের কাছে গচ্ছিত অতি প্রয়োজনীয় কোন সামগ্রী বিক্রি করে হলেও গোপনে তার অভাব মেটানোর চেষ্টা করে; যদিও সেই ব্যক্তি যে অভাবে আছে, তার সাথে জড়িত সবাই-ই বুঝতে পারে। কিন্তু তার পরও সে কারো কাছে উন্মুক্ত ভাবে সাহায্য চায় না। কারণ: মিসকিন শত অভাবেও কখনও কারো কাছে হাত পাততে চায় না। যার ফলে মহান মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন তাঁর নির্দেশানুসারে মিসকিনকে খুঁজে বের করে সাহায্য করতে বলেছেন। অপর পক্ষে ফকির সবাইকে দেখিয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়। এমনকি অনেক ফকির আছে, যাদের যথেষ্ট নগদ অর্থ থাকা সত্ত্বেও তারা ভিক্ষা করে বেড়ায়, আর এটাই তাদের স্বভাব। এই কারণেই হাদিসের তথ্যানুসারে “দুনিয়ায় জায়েজ যত কর্ম আছে, তার মধ্যে সবথেকে নিকৃষ্ট হল ভিক্ষা করা”। কাজেই দুনিয়াতে যেহেতু আমার একটি বিশেষ সমস্যার কথা গোপনীয়তার জন্য এই কান্ত প্রিয় মানুষ ছাড়া সকল মানুষের কাছে জানাতে চাই না, তাহলে যেই মহান সৃষ্টিকর্তা আমার সকল সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র একটি “কূন” শব্দের মাধ্যমে সমাধান করতে পারেন, তাঁর কাছে চাওয়ার সময় কেন সবার সামনে বা লোক দেখানো-ভাবে চাইতে হবে?  অথবা সেটা আবার দল বেধে সবাইকে নিয়ে চাইতে হবে?  তবে চাওয়াটি যদি নির্দিষ্ট এলাকার সবার জন্যই প্রযোজ্য হয়, সেটি আলাদা কথা। যেমন: রোদ, বৃষ্টি, খরা, আবহাওয়া ইত্যাদি, সেক্ষেত্র অবশ্যই একজন ইমামের নেতৃত্বেই চাইতে হবে।

দুনিয়ার পদ্ধতি থেকেই শিক্ষা নেয়া উচিত যে, প্রধান মন্ত্রী যদি কোন এলাকায় ভিজিটে আসেন, তাহলে সেই এলাকার মুখ্য দাবী যেমন বিদ্যুৎ, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ ইত্যাদির জন্য সেই এলাকার নির্ধারিত সংসদ সদস্য দাবী উত্থাপন করে থাকেন এবং প্রধান মন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন যে, আমি আপনাদের এম পি’র মাধ্যমে আপনাদের সমস্যার কথা জানতে পেরেছি। অতঃপর জনগণের সামনে তার অনুমোদন দিয়ে থাকেন। এই ক্ষেত্র জনগণের ব্যক্তিগত দাবী শোনার কোন প্রয়োজন পড়ে না। অপরপক্ষে কারো ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য প্রধান মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ব্যবস্থা আছে, যা সবারই জানা আছে। সেক্ষেত্রে কিন্তু সংসদ সদস্যের কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। যার দাবী তার নিজেকেই উত্থাপন করেতে হয়। কাজেই আমাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় চাওয়া আল্লহর কাছে আমাদের নিজেদেরকেই চাইতে হবে, এখানে ভাড়া করা ইমামকে দিয়ে চাওয়াতে কোন ফায়দা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ আমার ব্যক্তিগত সমস্যার সকল খবর ইমাম সাহেবের জানার কোন সম্ভাবনা বা ক্ষমতা নেই।

আমি নিজে সাধারণত জামায়াতে আদায় করা নামাজগুলোতে হাত তুলে দোয়া করি না। এর পিছনে সবথেকে বড় কারণ হল ইসলামে এই ধরণের দোয়ার বিন্দুমাত্র যায়গা থাকলেও সাহাবি (রাঃ) গন বলে যেতেন। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বাহিরের নামাজের কথা আলাদা। আমি লক্ষ্য করেছি যে, আমি যখন জামায়াতে ইমামের সাথে নামাজ আদায় করে ইমামের সাথে হাত তুলে দোয়ায় শরিক হই না, অর্থাৎ বসে বিভিন্ন দোয়া-কালাম পড়তে থাকি, তখন অনেকে এমনভাবে খেয়াল করে যে, আমি মনে হয় বড় ধরণের কোন অন্যায় করছি। অবশ্য নিজে যদি কখনও নামাজে ইমামের দায়িত্ব পালন করি, তাহলে সেক্ষেত্রে মূর্খ মুসুল্লিদের দিকে চিন্তা করে হাত তুলে নিঃশব্দে দোয়া করি। কারণ হল, আমি দোয়া না করলে মূর্খ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমাজে ফেতনা ছড়ানোর ১০০% সম্ভাবনা আছে। তবে বর্তমানে তাদেরকে প্রথমে ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী করে নিয়ে তারপরে আস্তে আস্তে সকল বিদ্‌য়াত থেকে সরে আসতে হবে। ইতিমধ্যে অনেক বিদ্‌য়াত থেকে আমরা সরে আসতে পেরেছি ইনশাআল্লহ। আমি মনে করি সকল আলেমদেরই এই পন্থা অবলম্বন করা উচিৎ। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islamqa.com/en/ref/21976/bid’ah 

http://www.islam-qa.com/en/ref/109360/loudly%20call%20for%20pray 

You may also like...

2 Responses

  1. I went over this site and I think you have a lot of good information, saved to fav 🙂

  2. Like says:

    Like!! Great article post.Really thank you! Really Cool.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *