তাবিজ-কবজে বিশ্বাস করা

130

মুসলমান মাত্রই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাতটি বিশ্বাস ফরজ করা হয়েছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস হল ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি বিশ্বাস করা। বিধানানুসারে কোন মুসলমান যদি ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস না রাখে তথা ভাগ্যকে অস্বীকার করে, তাহলে এমনিতেই সে কুফরিতে লিপ্ত হয়ে গেল বা কাফেরের খাতায় নাম লেখাল। আর আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন ইমানদার বান্দা যদি কুফরি এবং শিরকী থেকে বেচে থাকতে পারল, সেই ব্যক্তি জান্নাতে যাবে”। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, ‘যদি সেই ব্যক্তি জেনাকার হয়?’ আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন সেই ব্যক্তিও যাবে, তবে সেই ব্যক্তি যে পরিমাণ পাপ করেছে তার সাজা ভোগ করার পর”। যার কারণেই কিন্তু বলা হয় যে যে মানুষের মদ্যে তিল পরিমাণ ইমান আছে সে একসময় বেহেশতে যাবেই।

বর্তমান আলোচনা আমাদের তাবিজ নিয়ে। তাবিজ সংস্কৃতি কোন ইসলামি তথা আরবিয় সংস্কৃতি নয়। যাদু, টোনা বাণ ইত্যাদি মানব সংস্কৃতির শুরু প্রচলিত ছিল। হাদিসে দেখা যায় আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এক ইহুদি মহিলার দ্বারা যাদু-গ্রস্ত হয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে সুরা ফালাক এবং নাস অবতীর্ণ হয়। তবে শুরু থেকেই ভারত এই বিদ্যায় পৃথিবীর অন্যান্য জাতির চেয়ে এগিয়ে ছিল। ভারতের কামরুকামাক্ষা বলতে যায়গাটি যাদু সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বলেই এখনো আন্তর্জাতিক সমাজে প্রচলিত আছে। তারা এই বিদ্যায় বা অনেক সময় কুফরি কালামের মাধ্যমে শুধুমাত্র অসুস্থই নয় এমনকি একজন মানুষকে জানে মেরে ফেলারও ক্ষমতা রাখে। একটি হাদিসে আছে “কু-দৃষ্টি উটকে পৌছাতে পারে চুলা পর্যন্ত এবং মানুষকে পৌছাতে পারে কবর পর্যন্ত”। আমার জন্মভূমি গ্রামে এখন পর্যন্ত একাধিক মানুষ জীবিত আছে যেই ব্যক্তি কোন গাভীর দিকে যদি একবার দৃষ্টি দেয়, তাহলে সেই গাভীর যদি পূর্বের দিন ৪০ কেজি দুধ দোহন করা যায়, পরের দিন ০১ কেজি দুধ দোহন করার ক্ষমতাও কারো নেই। এমনকি গাভীর বাটের কাছে কোন মানুষ-তো নয়ই বরং তার নিজের বাছুরকেও যেতে দিবে না। এমন কোন চিকিৎসা বিদ্যা পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়নি যার দ্বারা সেই গাভীকে আর এক কেজি দুধ দেওয়ার যোগ্যতায় আনা যাবে। দরকার হলে গাভীর বাট দিয়ে দুধের যায়গায় রক্ত বের হবে। এখানে আবার খুবই একটা সহজ চিকিৎসা আছে। তাহলো সেই ব্যক্তিকে ডেকে এনে কিছু টাকা বা কিছু দুধ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে সে একটু পানি পরে দিবে আর সাথে সাথে গাভী আগে যেমন ছিল তেমনি হয়ে যাবে।

যাহোক তাবিজ এর বিশাল ক্ষমতা আছে ভেবেই ভারত উপমহাদেশের উর্দু ভাষায় অভিজ্ঞ আলেম সম্প্রদায়ের একটি অংশ এটাকেই রুজি এবং পুঁজির একটা মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলো। মুশরিক-গণ দিচ্ছিল তাবিজ যার মধ্যে থাকত বিভিন্ন প্রকারের গাছ গাছড়া বা অন্যান্য পদার্থ। আর এই হুজুররা আরবি অক্ষর গুলোকে বিভিন্ন মান নিরূপণ করে আম জনতার কাছে নিজেদেরকে পাণ্ডিত্য জাহির করতে শুরু করলেন। সেই সাথে তারা বিভিন্ন সুরা এবং আয়াতের ফজিলত হিসাবে এই করলে এই হবে ইত্যাদি ইত্যাদি ফজিলত বর্ণনা করে মানুষের কাছে বিক্রি তথা ব্যবসা শুরু করল। আর এই পদ্ধতির নাম দেয়া হল তাবিজের বিপরীতে কিন্তু মানানসই ‘কবজ’। আর এতেই হুজুরদের ব্যবসা বুমেরাং, যার ছিল-ছিলা এখনও সমাজে চলে আসছে।

আপনারাই বলুন, ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ কত উত্তম বাক্য। আর এই ভণ্ডরা এটাকে নাম ৭৮৬ মানে হল বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আধুনিক যুগের শিক্ষিত মানুষ এখনো এই তথ্যকে বিশ্বাস করে, এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর হতে পারে না। আমি নিজেও একসময় বই দেখে এই সকল আরবি অক্ষর ও শব্দ লিখে মানুষকে তাবিজ দিয়েছি। তবে এর বিনিময়ে টাকা নেয়াকে জায়েজ মনে করিনি। এমতাবস্থায় কিছু মানুষ আবার বলেছে যে, সে ভালও হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিশেষ ভাবে অধ্যয়ন করার পর এখন-তো এটা করিই না তবে এক বিন্দু বিশ্বাসও করি না। এর সবথেকে বড় প্রমাণ পেয়েছি আমার ছেলের এক শিক্ষকের মাধ্যমে। আমার স্ত্রীর একটি রোগের জন্য ছেলের অনুরোধে তাকে নিয়ে আসলাম, কারণ তিনি বিশাল বড় মাপের তাবিজ-কবজ হুজুর এবং যথেষ্ট খ্যাতি আছে। অনেক কষ্টে তাকে বাড়িতে আনার সিরিয়াল পেলাম। সে অনেক কিছু করে আমার বাসার চারি পার্শে থেকে অনেক কিছুই (শামুক-ঝিনুক জাতীয়) বের করলেন। নতুন মাটি ফেলে বাড়ি করেছি কাজেই এধরনের জিনিস পাওয়া তার জন্য খুবই সহজ ছিল। এক সময় তাকে তার হাদিয়া দিয়ে বের করে দেয়ার সময় হটাত করেই একটা কৌশলের আশ্রয় নিলাম। আমার ছেলের হাতে সেই তাবিজগুলো ছিল যার কারণে আমি তাদেরকে বুঝতে না দিয়ে ছেলের হাতের পিছনে আমার হাত দিয়ে তাবিজটা নিয়ে ফেললাম। ছেলেও বুঝতে পেরে কোন প্রকার নড়া-চড়া নাকরেই আমার হাতে তাবিজ দিয়ে দিল। তারপর আমি হুজুরকে বললাম যে, ‘চলেই যখন যাচ্ছেন তাহলে আরেকবার একটু ঝাড়া দিয়ে দেখবেন যে, তাবিজটা কোথায় আছে? তিনি আমার ছেলে বা তার ছাত্রের হাতেই যে তাবিজটা দিয়েছিল এটা তার শিষ্য দেখেছিল। কাজেই শিষ্যের হাতে ফুক দিতেই তুলা রাশির শিষ্যের হাত এক সময় আমার ছেলের কাছে চলে গেল। আমি হালকা একটু হেসে বললাম, ‘ভাই, তাবিজটা ওর কাছে নেই, ইতিমধ্যে সেটি আমার কাছে এবং এই যে দেখুন তাবিজ’ । তিনি একটু লজ্জাই পেলেন এবং বললেন যে, ‘একটু আগেই সম্ভবত এটি ওর কাছে ছিল, তাই ওর দিকেই হাত গিয়েছে।

আশা করি তাবিজের এবং এর মাধ্যমে ভণ্ড হুজুরদের আয় করা সম্বন্ধে আপনাদের ধারনাটা এখন যথেষ্ট মজবুত হয়েছে। মূলত তাবিজ কখনোই কারো ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না। এটা শুধুমাত্র ইমান নষ্ট করার একটি মাধ্যম। তাবিজে বিশ্বাস এবং ব্যাবহার উভয়ই কুফরি এবং শিরকী গুনাহ। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন সূরা কালামে লিখে দিয়েছেন য, পৃথিবী সৃষ্টি হবার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে আমার আপনার ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয়ে কলম মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে জমা হয়ে গেছে। অথচ তাবিজ করেই আপনি ভাগ্যকে পরিবর্তন করবেন তথা আল্লাহর কালামের বানীকে অসত্য প্রমাণ করবেন? একেবারেই সম্ভব না সুতরাং তাবিজ হারাম হারাম হারাম কাজেই একে না বলুন এবং সমাজ থেকে এই অভিশাপ মুছে ফেলুন। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://islamqa.info/en/20207 

http://islamqa.info/en/10543 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *