তারাবীর ইমামতিতে হাফেজ সাহেবদের টাকা নেয়া নাজায়েজ মনে করা

59

পূর্বে এ ধরনের মাসয়ালা শুনা না গেলেও বর্তমানে অহরহ শুনা যায় যে, রমযান মাসে হাফেজ-গন কর্তৃক কুর-আন খতম তিলাওয়াত শুনিয়ে তার বিপক্ষে টাকা নেয়া জায়েজ নেই। প্রশ্ন হল, বক্তৃতা গুলো দিচ্ছে কারা? উত্তর হল বাংলাদেশের খ্যাতনামা আলেম, মুফতি ইত্যাদি। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, তাহলো যারা মাসয়ালাগুলো দিচ্ছেন তারা কোন মসজিদে ইমামতি করেন কি-না। উত্তরটা কিন্তু খুব পরিষ্কার, তাহলো কোন না কোন একটি মসজিদে ইমামতি তাঁরা করেনই। তাহলে সেখানে তাদের ইমামতির বিনিময়ে টাকা নেয়া জায়েজ থাকলে হাফেজদের কর্তৃক তারাবীর নামাজে ইমামতি করে তার বিনিময়ে টাকা নেয়া জায়েজ হবে না কেন? ফতোয়াবাজদের বর্ণনায় উত্তরটা খুবই পরিষ্কার; তাহলো ইমাম ফরজ নামাজ পড়ায়, তাই তার বিনিময়ে টাকা নেয়া জায়েজ আছে। অপর পক্ষে হাফেজ-গন সুন্নত নামাজের ইমামতি করে বিধায় তাদের দ্বারা টাকা নেয়া জায়েজ নেই।

এখন মূল আলোচনায় আসা যাক। তাহলো ইমামতি কে করবে? এই প্রশ্নের উত্তর একাধিক হাদিসে রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই দিয়ে গেছেন। তার প্রতিটি হাদিসেই প্রথম অগ্রাধিকার হল সেই ব্যক্তির, যে কুর’আনের বেশী অংশ জানে। আমরা সবাই যে বালকটির কথা জানি, যে সর্ব প্রথম কোন সম্পূর্ণ গোত্রের ইমমতি করেছিলেন, তা কিন্তু একমাত্র কুর’আনের মধ্য থেকে সর্বাধিক অংশ আয়ত্ত তথা মুখস্থ জানার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। নামাজের জন্য যে সকল মাসয়ালা বা বিধান জানা দরকার, তা প্রায় প্রতিজন হাফেজই জানেন। তারপরও যদি কিছু কমতি থাকে, তাহলে সে বিষয়গুলো জেনে নিতে তেমন বেশী কোন সময়ের প্রয়োজন হয় না। এর অর্থ হল একজন হাফেজ যে কোন সময় নামাজ পরিপূর্ণ রূপে আদায় করার জন্য যে বিষয়গুলো জানা দরকার তা খুব সহজেই শিখে বা জেনে নিতে পারেন। অপর পক্ষে কি কোন মুফতি, মাওলানা এবং মুহাদ্দিসদের দ্বারা সম্ভব হবে ইচ্ছা করলেই হাফেজ হওয়া? মোটেও তা সম্ভব নয় যদি না আল্লাহ রব্বুল আলামীন বিশেষভাবে কারো উপর সদয় হন। তবে সাধারণত এধরনের কোন নজির সচরাচর দেখা যায় না। মুফতি ফতোয়া দিবে, মুহাদ্দিস হাদিসের সঠিক সিদ্ধান্ত দিবে, এবং মুফাসসির কোর’আনের আয়াত সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য জানবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিয়মানুসারে ইমামতির বেলায় হাফেজের আগে আর কারো কোন অধিকার নেই। কারণ প্রতিজন হাফেজই হেফজ শিক্ষা করার পূর্বে নাজেরা বিভাগে ক্কারিয়ানা বা শুদ্ধরূপে কোর’আন পড়া শিক্ষার পরই কেবল হাফেজ হওয়ার জন্য তালিম নিতে যায়। তবে সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকই যদি শুদ্ধরূপে কুর’আন না পড়তে পারেন, তাহলে সেক্ষেত্রে সেই ছাত্রের দোষ না বরং দোষ হল সেই শিক্ষকের এবং তার অভিভাবকের। যাহোক ক্ষেত্রবিশেষ দেখা যায় অনেকেই হাফেজ হওয়ার পর মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুফাসসির হয়েছেন। কিন্তু এমন কি কেউ দেখেছেন যে, কোন ব্যক্তি মুফতি, মুহাদ্দিস বা মুফাসসির হওয়ার পর কোন ব্যক্তি হাফেজ হয়েছেন? আমার মনে হয় কেউই শোনেননি।

মহান আল্লাহর পবিত্র কিতাব আল কুর’আন সম্পূর্ণরূপে নিজ বক্ষে ধারণ করে রাখার কারণে পৃথিবীতে আল্লাহর কাছে হাফেজ একজন অতি সম্মানী ব্যক্তি। রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়ে হাফেজ উপাধিই ছিল একমাত্র বিশেষণ। বর্তমানে যে সকল মুফতি, মুহাদ্দিস এবং মুফাসসির বিশেষণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা সাহাবিদের পরবর্তী যুগের। আর মাওলানা বিশেষণের সৃষ্টি ১০০ বৎসরই পুরা হতেও অনেক দেরী আছে। সমগ্র বিশ্বে একমাত্র হাফেজদের শিক্ষা এবং বর্ণনাই এক প্রকারের। এছাড়া পৃথিবীর সকল মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির এক ধরনরে শিক্ষা গ্রহণও করেন না এবং তা একই রূপে বর্ণনাও করেন না। যার ফলে ফতোয়া, হাদিসের ব্যাখ্যা এবং কুর’আনের ব্যাখ্যায় পৃথিবীর আলেমদের মধ্যে এত মতপার্থক্য। সেক্ষেত্রেও পৃথিবীর সকল  হাফেজদের রয়েছে একই ধরনের শিক্ষা ও বর্ণনা। আন্তর্জাতিকভাবে একমাত্র হাফেজদেরই প্রতিযোগিতা হয়, অন্য কোন উপাধিদের প্রতিযোগিতা হয় না। অথচ এতগুলো বিশেষ গুন হাফেজদের থাকা সত্ত্বেও অথবা সবথেকে সম্মানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরাই রয়েছে আর্থিক  ভাবে সবথেকে অসচ্ছল ও নাজেহাল অবস্থায়। এর পিছনে মূল ভূমিকা কাদের, তা পাঠকদের উপরই ছেড়ে দিলাম।

আমাদের দেশের আলেম সাহেবদের যদি এতই বাধে যে, সুন্নত নামাজ তথা তারাবী পড়িয়ে টাকা নেয়া জায়েজ নেই, তাহলে তাঁরা একমাসের জন্য সকল দায়িত্ব হাফেজ সাহেবের কাছে ছেড়ে দিয়ে এক মাসের নিজের বেতনের লোভ ছাড়তে পারেন না কেন? এমনও অহরহ দেখা যায় যে, ইমামের পূর্ণ ভাতা পরিশোধ করার পর মুসুল্লি-গন যদি হাফেজ সাহেবকে কিছু দিতে চান, তাতেও ইমাম সাহেব বাধ সাধেন এবং ফতোয়ার আশ্রয় নিতে চেষ্টা করেন। আলেম-গন বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, হাফেজদের কুর’আন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করলে তা কুর’আনের আয়াতকে বিক্রয়ের সামিল করা হয়। হাফেজ-গন যদি রমজান মাসে কুর’আন তিলাওয়াত করে তার বিনিময়ে টাকা গ্রহণ করলে না জায়েজ হয়, তাহলে বাৎসরিক ইমাম সাহেবরা কি অন্য সময়ে নামাজে গীতা পাঠ করেন নাকি? তারাওতো এই কুর’আনই পাঠ করেন! তাহলে একজনেরটা জায়েজ হলে অন্যজনেরটা জায়েজ হবে না কেন? হাফেজ সাহেব-গন কি বলেন নাকি যে, এত টাকা না দিলে আমি খতম তারাবী পড়াব না? মোটেও না; বরং নিয়মিত ইমাম সাহেব-গনই বেতন নিয়ে বেশী দরা-দরি করেন এবং ক্ষেত্রবিশেষ অন্য মসজিদে চলে যান।

মোট কথা হল রমজান মাসে সাধারণত মুসুল্লির সংখ্যা তুলনামূলক-ভাবে বেশী হয় এবং হাদিয়ার পরিমাণটাও থাকে বেশী। হাফেজ সাহেব গন একমাসের ইমামতিতেই এত টাকা পেল, আর নিয়মিত ইমাম প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করে  মাসিক কত কম টাকা পায় , এটাই হল সবথেকে বড় প্রতিহিংসার বিষয়। তাই মনের রাখা উচিত যে, ইমাম সব সময় ইমামই, হোক না তা ফরজ, সুন্নত, নফল বা জানাজার নামাজ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিষয়ে প্রশ্ন রাখলে তাঁরা বলেছেন যে, “অন্যান্য নামাজ এবং তারাবীর নামাজে যে ইমামের বেলায় কোন পার্থক্য আছে, তা আমাদের জানা নেই”। মোট কথা হল ইমাম এবং মুয়াজ্জিনের জন্য বিনিময় সরূপ টাকা না নেয়াটাই উত্তম। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে আর্থিক সচ্ছলতার জন্য বিনিময় নেয়াটাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে নিয়মিত ইমাম এবং রমজান মাসের জন্য নির্ধারিত হাফেজ ইমামদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্যটা হল মনের এবং স্বার্থের। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islam-qa.com/en/1875 

http://en.allexperts.com/q/Islam-947/2012/6/salary-hafej-quran-ramadan.htm 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *