মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে ভাষণ দেয়া এবং কবর দেওয়ায় বিলম্ব করা

45

মৃত্যুর পর কবর দেওয়ার মাধ্যমেও চলে আমাদের শেষ বিদ্‌য়াতী কার্যক্রম। নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনটি কাজ তারা-তারি করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তার মধ্যে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন হল একটি। অথচ আমাদের মধ্যে যখন কেউ মারা যায়, তখন আমরা লাশটা সামনে রেখে প্রচুর কান্না-কাটির সম্মুখীন হই, যা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। মানুষ মারা গেলে সাধারণত কান্না-কাটি করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে তার মানে এই নয় যে, মহিলা-গন উচ্চ স্বরে বিলাপ করে কাঁদবে। মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্য যতই কান্না-কাটি করা হোক না কেন, সে মুহূর্তেও তাদের পর্দার দিকে খেয়াল রাখা উচিৎ।

মহিলাদের মধ্য একটি স্বভাব বেশী পরিলক্ষিত হয়, তাহলো যখন কোন এলাকায় কেউ মারা যায়, তখন সে এলাকার মহিলা-গন দল বেধে সে মুর্দা-বাড়িতে গমন করে এবং পর্দার খেলাপ করে ফরজ তরক করে। তার পর শুরু হয় এই লাকার মসজিদের মাইকে ঘোষণা এবং একটি মাইক ভাড়া করে এই লাকার সকল রাস্তায় রাস্তায় ঘোষণা। অথচ ইসলাম এটাকে মোটেও সমর্থন করেনি। মনে রাখবেন, যেখানে মসজিদের যে স্থানে দাড়িয়ে মানুষকে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে কোন প্রকার জানাজা বা হারিয়ে যাওয়া সামগ্রীর ঘোষণা দেওয়া মোটেও বৈধ নয়। মুর্দাকে গোসল দেওয়ানোর সময় আবার ক্ষৌর কর্ম করানো হয়, যা মোটেও বৈধ নয়, কারণ মানুষ মারা গেলে শুধুমাত্র তাকে গোসল দেয়ানো ছাড়া ইসলাম কোন কিছুকে অনুমোদন করেনি। এই জন্যই প্রতিজন ব্যক্তিকে প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। আর সে জন্যই তার নাপাক পশম/চুল নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই পরিষ্কার করা উচিৎ। মৃত্যুর পরে আর তার ছতর খোলা যাবে না। এমতাবস্থায় কেউ যদি অপরিষ্কার থাকে, তার জন্য সেই দায়ী হবে।

মানুষ মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া মাত্রই যেমন কান্না-কাটির রোল পরে যায়, সে সাথে অপর কিছু লোক বলে থাকে যে, “এখানে কে কে কোর’আন শরীফ পড়তে পারে, সে সে কুর’আন পড়া শুরু কর”। মূলত: এই পরিস্থিতিতে কুর’আন পড়ার কোন ভিত্তি ইসলামে নেই। এমতাবস্থায় মৃতের দেহ নাপাক থাকে। তাছাড়া গোসল দেওয়ার পর দেহ পাক হয় ঠিকই, কিন্তু তার আর কোর’আন তিলাওয়াত শ্রবণ তথা ফজিলত লাভের কোন উৎসই থাকেনা, কারণ: তার আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে হাদিস কর্তৃক প্রমাণিত যে, “যখন কোন ব্যক্তি মমূর্ষ অবস্থায় থাকে, তখন যদি তার সামনে কুর’আন শরীফ বিশেষ করে সূরা ইয়া’ছীন তিলাওয়াত করা হয়, তাহলে সে ব্যক্তির মৃত্যু যন্ত্রণা কম হয় তথা সহজ হয়”।

মানুষ মারা গেলে তার সকল আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, কাজেই এই ধরনের তিলাওয়াতে তার কোন কাজেই আসে না। বরং এটা একটি সামাজিক বিদ্‌য়াত এবং আলেমদের অজ্ঞতার কারণেই এই ধরনের কার্যক্রম সমাজ থেকে যাচ্ছেনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তীতে আবার কোন একটি হাফেজীয়া মাদ্রাসার কিছু ছেলেকে নিয়ে এই সে বাড়িতে কোর’আন খতম করায় এবং মৃতের জন্য দোয়া করিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে। এই ধরনের কার্যক্রমের কোন অনুমোদন ইসলামে নেই। এই ধরনের কোর’আন তিলাওয়াতে হাফেজদেরই কোন ফজিলত নেই, আর যে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা হবে, তার ব্যাপারে-তো কোন প্রশ্নই উঠে না। অতএব সবাইকে এই ধরনের অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকা উচিৎ।

তারপরে হল জানাজার পর্ব। আমরা লক্ষ্য করতে পারি যে, যখন ফাতিমা (রা:) মৃত্যু বরন করেন, তখন আলী (রা:) তার স্ত্রীর ওছিয়ত অনুসারে কাল বিলম্ব না করে খুব অল্প সংখ্যক সাহাবী নিয়েই যথা শীঘ্র দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। তখন সর্ব শ্রেষ্ঠ সাহাবী আবু বকর সিদ্দিক (রা:) আমিরুল মু’মিনিন থাকা সত্ত্বেও আলী (রা:) তাঁকে বলার মত সময়টুকু অপেক্ষা করারও প্রয়োজন মনে করেননি। পরবর্তীতে অবশ্য আবু বক্কর সিদ্দিক (রা:) খাতুনে জান্নাতের জানাজায় সরিক না হতে পারায় আলী (রা:)এর কাছে অনেক আফসোস করেছিলেন। আর বর্তমানে আমাদের মৃত্যু ব্যক্তিকে সামনে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন অপেক্ষা করি। এর পর মুর্দাকে সামনে নিয়ে মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজনৈতিক ভাষণের মত ভাষণ দিতে থাকি। নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুর্দাকে যথা শীঘ্র মাটির নীচে দাফন করতে বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, “যদি লোকটি ভাল হয়, তাহলে তারা-তারি তার স্থায়ী ঠিকানা বেহেশত দেখতে পাবে। আর যদি লোকটি খারাপ থাকে, তাহলে দুনিয়া একটি খারাপ লোকের কাছে থেকে তারা-তারি মুক্তি পাবে”।

অতএব মুর্দাকে সামনে রেখে সকলে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে একজনের পর একজন ভাষণ দিবে, আর বাকি সবাই শুনবে এটা সম্পূর্ণরূপে হারাম তথা নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশের পরিপন্থী। তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে যে কোন ওয়ালি বা প্রতিনিধি মৃতের পক্ষে যে কোন ঋণ সম্বন্ধে ঘোষণা করতে পারেন। প্রচলিত আরেকটি ভ্রান্ত মতবাদ হল, সেখানে দাড়িয়ে একজন তিন বার বলেন, “লোকটি কেমন ছিল”, সবাই সমস্বরে উত্তর দেয়, “ভাল ছিল”।

বর্ণনা করা হয় যে, ৪০ জন লোক যদি বলে যে লোকটি ভাল ছিল, তাহলে তার কবরের গোর আজাব মাফ হয়ে যবে। এটা হল স্বল্প জ্ঞানের ইমামদের নিজস্ব মন্তব্য, যা কি-না মূল তথ্য না জেনে অযথা ’উদর পিণ্ডি বুদর ঘারে চাপানো’। লোকটি ভাল ছিল এটা-তো বলে সবাই এক পেট খাওয়ার জন্য। তাছাড়া যারা জানাজায় দাঁড়িয়ে অপর ব্যক্তির জন্য ভাল বলে, তাদের ৯০% লোক ফরযে আইন মানে না তথা নামাজই পড়েনা। সে ব্যক্তিদের ভাল মন্দ বলার প্রভাবে আল্লহর কাছে কোন কিছুই যায় আসে না, তাই তিনি এই দিকে খেয়াল দেয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। উপরে বর্ণিত হাদিসে আবু বক্কর সিদ্দিক (রা:) আয়েশা (রা:) সম্পর্কে যেভাবে আফসোস করেছেন, কাউকে জিজ্ঞাসা অথবা অনূরোধ করা ছাড়াই সেভাবে যদি তার মন থেকেই মৃত ব্যক্তির সম্বন্ধে ভাল মন্তব্য বের হয়ে আসে, তাহলে মহান আল্লহ রব্বুল আলামীন অবশ্যই ক্ষমাশীল। অতএব ভাল-মন্দের জিজ্ঞাসার উত্তর কারো প্রশ্ন করা ছাড়াই যদি মন থেকে আসে, তাহলে সেই ভালই কেবল ভাল জোড় করে পাওয়া ভাল নয়।

কবর দেওয়ার সময় মনে করা হয় যে মুর্দা কবরের মধ্যে উঠে বসে। বেশীর ভাগেরই ধারনা কবরের ভিতরে মানুষকে উঠিয়ে বসানো হয়। এই জন্যই ভিতরের যায়গাটা এত বেশি ফাকা রাখা হয়, যাতে একজন মানুষ সহজে বসতে পারে। মুল কথা হল মৃত ব্যক্তিকে কখনো কবরে উঠিয়ে বসানো হয় না। উদাহরণ সরূপঃ আমরা রাত্রে ঘুমিয়ে যেভাবে স্বপ্ন দেখি, অর্থাৎ সাপ-বিচ্ছুর ভয়ে দৌড়াই, কেউ আঘাত করলে ব্যথা পাই এবং কেউ উপকার করলে আনন্দ পাই, ঠিক একই ভাবে কবরে সকল কার্যক্রম চলে রূহের উপর, দেহের উপরে নয়। আর এই ভাবে একদিন প্রায় সকল মানুষেরই দেহ পচে মাটির সাথে মিশে যায়। লাশ পচে গেলেও ব্যক্তির দুনিয়াবি কার্যক্রমের প্রতিফল কিয়ামত পর্যন্ত তার রূহের উপর চলতে থাকবে। স্বপ্নের আঘাত শরীরে ব্যথা পায় বলেই মানুষ চিল্লায়ে উঠে অথচ পরে দেখতে পায় যে, সে বিছানাতেই শুয়ে আছে; অথচ স্বপ্নে ব্যথা পাওয়ার কারণে তার হ্রদ কম্পন হচ্ছে। যাহোক সুন্নতী নিয়মে গর্ত করার কারণ হল যাতে বাঁশের খণ্ডগুলোর উপরের মাথা মাটির উপরিভাগ থেকে কমপক্ষে এক-দেড় হাত নীচে থাকে, ফলে কোন বন্য হিংস্র প্রাণী কবর থেকে লাশ তুলে নষ্ট করতে পারেনা। এই জন্যই বলা হয়েছে, কবরের মাটি ভাল করে পা দিয়ে খুঁচে একটু মজবুত করে দেওয়া উচিৎ। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islamqa.com/en/ref/109187/bid’ah 

You may also like...

1 Response

  1. Kalea says:

    A on the website shows similar concerns about the legality of the UK rules have long been expressed, whilst Digital Rights Ireland has welcomed the Labour party’s nelre-yxpwessed about the data retention powers in the 2005 Act. Better late than never.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *