সভা খাওয়া এবং যিয়ারত খাওয়া

পূর্বে শুনেছি মানুষ সভা শুনতে যায়, কিন্তু এখন দেখি মানুষ সভা খেতে যায়। বাংলাদেশের সব যায়গায়ই কম-বেশি সভা হয়, কিন্তু বগুড়া এই লাকার মত এত অধিক সভা আর কোথাও হয় না। বগুড়া জেলা নর্থ বেঙ্গল তথা দেশের বক্তা আলেমদের জন্য একটা শীতকালীন বিচরণ ভূমি। প্রথানুসারে যে গ্রাম অথবা পাড়ায় সভা হয়, তার আশে-পাশের পাঁচ-ছয় বর্গ কিলোমিটারের মধ্য সকল আত্মীয় স্বজনকে সভায় দাওয়াত দিতে সে এলাকার লোক বাধ্য। সভাকে উপলক্ষ করে একটা বিশাল আয়োজনের ধুম পরে যায়। যথা সময়ে সকল মেহমান এই সে বাড়ি ভরে যায়। রাত্রে সভা শুরু হয়, আর সকল মেহমান গল্প-গুজব ও আড্ডায় মেতে উঠে। বেশির ভাগ সময়ই সভার মঞ্চ থেকে ডাকতে শোনা যায় যে, “যার যার যে মেহমান আছে, তাদেরকে নিয়ে সভা মঞ্চের সামনে হাজির হোন”।

যতগুলো মেহমান আসে, তার ২০% লোকও সভায় হাজির হয় না। কারণ: সকল সভার পাশেই একটি মেলা লাগানো থাকে, যেখানে সকল ধরনের খাদ্য সামগ্রী থেকে শুরু করে কসমেটিক এবং মেয়েলী আইটেমের এমন কোন জিনিস নেই, যা পাওয়া যায় না। তাই যারাই সভার উদ্দেশ্যে বের হয়, তাদেরকে নিয়ে শয়তান প্রথমে প্রবেশ করায় সে মেলায়। সেখানে বিভিন্ন কেনা কাটা করে সে সামগ্রী আবার বাড়িতে পৌছিয়ে খুব কম লোকই পুনরায় সভায় ফিরতে পারে। আমি জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছি যে, সে সকল মেলায় পুরুষ-মহিলার পছন্দ অনুসারে কেনা-কাটার মজাই না-কি আলাদা। যাহোক যেহেতু জালসাটা ধর্মীয়, তাই এই সুযোগে ছেলে-মেয়েদের দেখা সাক্ষাতের একটা ব্যবস্থাও ধর্মের ছায়া তলেই কৌশলগত ভাবে হয়ে যায়। সব থেকে বড় লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ঐ সভায় যে বক্তাকে আনা হয়, তিনি সবই দেখেন, জানেন এবং বুঝেন; কিন্তু আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় কেউই জোরালো ভাবে মেলা সংক্রান্ত ব্যাপারে কোন নিষেধ করেননা বা কঠোর নির্দেশ দেন না। অবস্য কেউ কেউ তাদেরকে সভাস্থলে আসার জন্য আহ্বানও করেন।

আমার কথা হল, যে সভার বক্তা সভা মঞ্চের সাথেই অবস্থিত সম্পূর্ণ হারাম নারী-পুরুষের মিলন মেলাই বাদ দেওয়াতে পারেন না, সে বক্তার দ্বারা ধর্মের কি উন্নতি সাধন হবে?  তাদের কাজ শুধু টাকা উপার্জন করা; ধর্মীয় বিধানে মানুষকে পাকা-পোক্ত করানো নয়। তারা এক বছর বক্তৃতা করে যান এবং পরবর্তী বৎসরের জন্য ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যান। তারা কেউ কি কখনো বলেছেন যে, “যদি এর পর থেকে এই হারাম মেলা বাদ দিতে না পারেন, তাহলে আর আমাকে ডাকবেন না, আর ডাকলেও আমি আসব না”?  অবশ্যই না, কারণ: একথা বললে যদি আবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়! কাজেই আমি সবাইকে অনূরোধ করব যে, সভা কখনোই খাওয়ার জিনিস নয়, বরং সভা হল শুনার বিষয়। সভা শুনে নিজের ইমানকে নতুন গতিতে তাজা করার বিষয়। হাদিসের তথ্যানুসারে জানা যায়, ‘রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মেরাজে গিয়ে দেখেছিলেন যে, কিছু মানুষের চোয়াল কাঁচি দিয়ে চেড়া হচ্ছে। তখন তিনি জিব্রাইল (আঃ) কে প্রশ্ন করলে জিব্রাইল (আঃ) উত্তর দিয়েছিলেন যে, “এরা হলো আপনার উম্মতের সেই সকল বক্তা ও খতিব, যারা নিজেরা যা অপরকে বলে, কিন্তু সেই অনুসারে নিজেরা আমল করে না”। কাজেই বর্তমান সময়ের বক্তাদের নিজস্ব পারিবারিক তথ্য একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন, তাহলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। সুতরাং ধর্মীয় সভার নামে বর্তমান পদ্ধতির ৯৫% মিলন মেলা বা খাওয়া-দাওয়ার সভা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। ধর্মীয় নিয়ম রিতি-নীতি সঠিক না হওয়াতে এধরনের সভায় শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন, খাওয়া-দাওয়া এবং দেখা-সাক্ষাৎই সম্বব। এতে মোটেও ইমানের কোন উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আরবি ভাষার যিয়ারতের ভাবার্থ হল হাজিরা, উপস্থিতি বা পরিদর্শন ইংরেজিতে বলে Vigit. সে হিসাবে ইসলামে যিয়ারত শব্দটি এই সেছে কবরের বেলায়। অর্থাৎ কবর যিয়ারত। অধুনা আমাদের দেশের অনেক এলাকায় এই যিয়ারত শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে বৎসরের ফজিলত-পূর্ণ দিন সমূহের আমল বাদ দিয়ে বিদ্‌য়াত পন্থি মিলাদ পড়ে সবার শেষে নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে কিছু খাদ্য সামগ্রী পাকিয়ে অবশেষে বণ্টন করে খাওয়াকে বলে যিয়ারত। সবথেকে ঘৃণার ব্যাপার হল, এখানেও সে মাওলানা খেতাব প্রাপ্ত হুজুর উপাধি ধারী ব্যক্তি-গন নির্দ্বিধায় এই সকল অনুষ্ঠান পালন করে যাচ্ছে। অবশ্য এতে তাদের একটু লাভও আছে, তাহলো চাঁদা না দিয়েও ঠিকই সে খাদ্য সামগ্রীর একটি ভাগ সে হুজুর পেয়ে থাকে। আর যদি মিলাদ পড়ায়, তাহলে মিলাদ শেষে মুসাফার নামে হাত বদল হয় সে মিলাদ দাতাদের কোন একজনের হাতের সাথে……..। বাকি বিষয়টা আপনারাই জানেন।

ধিক আলেম, ধিক তব কার্যবিধি, তুমি এত লোভী?                                                                 দিয়াছ বিসর্জন তব ধর্মীয় বিধান শুধু স্বার্থের লাগি!

মোট কথা হল ইসলামে কবর যিয়ারত একটি বিশিষ্ট আমল। সব সময় সম্ভব না হলেও বিশেষ বিশেষ দিন সমূহে কবরস্থানে যেয়ে নিজ পরিজনদের মধ্যে থেকে যারা মৃত্যু বরণ করেছেন, তাদেরকে স্মরণ করার নামকেই বলে কবর যিয়ারত। সেখানে যেয়ে কবরে মুর্দার সিনা বরাবর পশ্চিম পার্শে পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে যতটুকু ধর্মীয় দোয়া -দরূদ জানা আছে, সে অনুসারে পড়ে অতঃপর কবরের উত্তর পার্শে মাথা বরাবর পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে মৃতের রূহের মাগফেরাতের জন্য আল্লহর কাছে ফরিয়াদ জানানো উচিৎ। এখানে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তাহলো, কোন ব্যক্তির সন্তান বা আওলাদ যদি তার জন্য দোয়া করে, তাতে যতটুকু ফল হবে, সে ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের সকল ভাড়াটিয়া আলেম যদি একসাথে সে দোয়া করে, তাহলেও ততটুকু ফল হবে না। কারণ: মানুষ মরে যাওয়ার সাথে সাথে তার আমলের সবগুলো রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। শুধু খোলা থাকে তিনটি রাস্তা। তার মধ্যে একটি হল তার আওলাদ বা নেক সন্তান। তাই আপনারা হুজুর ভাড়া করা বাদ দিয়ে বরং নিজে কবর যিয়ারত করতে শিখুন। সে সাথে বুঝতে শিখুন যে যিয়ারত কোন খাওয়ার বিষয় নয়, বরং তাহলো কবরস্থানে হাজিরার বিষয়। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islamqa.com/en/ref/10225/bid’ah

 

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *