মসজিদ-মাদ্রাসার নামে চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় জনসভা করা

বর্তমানে ধর্মীয় জনসভার নামে দেশের বিশেষ কিছু অঞ্চলে যে ধরনের চাঁদা আদায়ের পদ্ধতি চালু হয়েছ, তা নিতান্তই কোমল-মতি ছেলেদের ডেকে নিয়ে এই সে পরোক্ষ ভাবে ভিক্ষা বৃত্তি শিক্ষা দেওয়ারই সামিল। মুসলমান দেশে-তো আর টুপির অভাব নেই, তাই চাঁদা তোলার যায়গা হিসাবে প্রথম সারিতে কোন সরকারী হাট, সাথে কোন জনসভার কিছু পোস্টার, বাজার থেকে ভাড়া করা টেবিল, চেয়ার ও মাইক এবং হয়তোবা কোন মাদ্রাসা থেকে ভাড়া করা কয়েক জন শিশু, নয়তো এই লাকার কিছু ছোট- ছোট ছেলে পেলে, হতে পারে তারা কোন স্কুলের ছাত্র, আর সে সাথে দুই একজন বড় মানুষ, সাথে থাকতে পারে কোন একজন পেশাদার ভাড়াটিয়া বক্তা; সবে মিলে এই হল চাঁদা আদায়ের সামগ্রী। তাদের দেখে কষ্ট হয় এই জন্য যে, নিকটস্থ মসজিদে আজান হচ্ছে, অথচ তাদের বক্তৃতা বন্ধ হচ্ছে না এবং কেউ নামাজ পড়তেও যাচ্ছেনা। যারা অর্থ আদায়ে ব্যস্ত, তাদেরকেও নামাজে পাঠানো হচ্ছে না। মানুষ রিক্সা, ভ্যান, সাইকেল, পায়ে হেটে অথবা গাড়ীতে যেভাবেই যাক না কেন, আদায় কারীদের কাজ হল তাদেরকে ঠেকানো, এবং টাকা দিলেই কেবল ছাড় পাওয়া। এর পর আবার আদায় যখন শেষ হবে, তারপর আছে খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। যদি প্রশ্ন করা হয়, চাঁদা তুলে কি হবে?  উত্তর হবে, চাঁদা তুলে প্যান্ডেল করতে হবে, ইছালে ছওয়াব বা শেষ রাত্রিতে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আছে এবং হুজুরকে দিতে হবে ইত্যাদি। চাঁদা উঠানোর সময় এমন এমন সূরের বচন শুনানো হয়, যা একেবারেই ইসলামের তথ্যের বাহিরে। যেমন:  

আমিনো আমিনো আল্লহ আমিনো                                                                                             দানকারীদের হইও তুমি জামিনো।

আপনারাই বলুন, আল্লহ কি কোন কাজের জামিন হতে পারেন?  আমরা আদালতের দিকে যখন তাকাই, তখন দেখতে পাই যে, বিবাদীর পক্ষ হয়ে উকিল জামিন প্রার্থনা করেন, আর তার পর কেস বুঝে হাকিম জামিন মঞ্জুর করেন। সেখান জামিন হয় কোন একজন ব্যক্তি, যার হয়ে কাজ করেন একজন উকিল। আল্লহ যদি জামিনদার হয়, তাহলে জামিন দাতা হবেন কে? (নাউজুবিল্লাহ) যেখানে নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হবেন জামিন দার, সেখানে আল্লহকে জামিন দার বলে কত বড় ভুল করা হচ্ছে, একবার হিসাব করে দেখেছেন কি?  একদিকে আল্লহকে সকল ক্ষমতার মালিক বলা এবং অন্যদিকে তাঁকে অতি তুচ্ছ বিশেষণে বিশেষায়িত করা সাংঘাতিক গুনার কাজ। আবার বলা হয়ঃ

দানকারীর পিতা-মাতা আল্লহ সুখে রাইখো কবরে                                                                              নুরের টুপি মাথায় দিয়া উঠাইও হাশরে।

এমন কোন হাদিসের তথ্য কি এই পর্যন্ত কেউ শুনেছেন যে, দান করলে তার পিতা- মাতাকে নূরের টুপি মাথায় দিয়ে হাশরের ময়দানে উঠানো হবে?  নূরের টুপি কেবল সে সকল পিতা-মাতার জন্যই প্রযোজ্য, যার সন্তান হাফেজে কুর’আন, এবং সে নিজেও একজন ইমানদার। কোন লোকের নিজের যদি ইমান না থাকে, তাহলে তার সন্তানের হাফেজ হওয়া তার কোন কাজেই আসবে না। সন্তানের আমলে যদি পিতার বেহেশ্‌ত হতো, তাহলে ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পিতার জন্য দোয়া করে তাকে বেহেশতে নিয়ে যেতে পারতেন। ফালতু কথা বলে ধর্মের দোহাই দিয়ে চাঁদা উঠানো প্রতারণারই নামান্তর মাত্র। আসলে যারা চাঁদা উঠানোর কাজে নিয়োজিত থাকে, তাদের অনেকে থাকে পেশাদার, আবার কেউ কেউ থাকে ধর্মের লেবাছে নিতান্তই অজ্ঞ ব্যক্তি। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হল চাঁদা উঠানো। সেখানে কি বলা হল, তার অর্থই বা কি হতে পারে, এই দিকে খেয়াল না দিয়ে বরং বিভিন্ন করুণ সুরে মানুষকে আকর্ষণ করাই হল মুখ্য উদ্দেশ্য।

এখন আসি হুজুরদের প্রসঙ্গ। হুজুর মানেই হল কোন এলাকায় বক্তা হিসাবে খ্যাতিমান ব্যক্তি। কোথাও যদি কোন হুজুর একবার গিয়ারে উঠে যায়, তাহলে-তো আর কোন কথাই নেই। তাঁকে ছাড়া সে জলসাই হবে না। দরকার হলে জনসভার তারিখ পরিবর্তন করতে হবে। তিনি আবার কম টাকায় আসবেন না, তার খাওয়ার জন্য থাকতে হবে আলাদা মেনু। এটা অবশ্য সকল হুজুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে আবার বশীর ভাগ হুজুরেরই এই লার্জির সমস্যা বা গ্যাস্ট্রিক থাকে তো, তাই হুজুরের সহকারীর মাধ্যমে উনাকে ভাড়া করার সময়ই বলে দেওয়া হয় উনার পছন্দ এবং অপছন্দ সম্বন্ধে। যাহোক উনাকে আবার মঞ্চে উঠানো হয় কম পক্ষে রাত দশ-এই গারটার পরে। উনার মধুর সুরে মানুষ কখনো হাসে, আবার কখনো কাঁদে। আবার উনারা কখনো এমন করে চিৎকার করেন ও ক্ষেপে যান যে, উনাদের কণ্ঠই পরিবর্তন হয়ে যায়। তাছাড়া বাংলা ভাষায় এক, দুই, তিন বা চার আলিফ মাদ্দ অথবা সুরের ব্যবস্থা নেই, কিন্তু উনারা গানের মত সুর করে ওয়াজ করার এই পদ্ধতি কোথায় পেয়েছেন, তা উনারাই জানেন। তবে আমার ধারনা, উনারা ওয়াজ করেন ঠিকই, কিন্তু বাংলা ভাষা সম্বন্ধে উনাদের ধারনা এবং শিক্ষা একেবারেই কম। উনারা সিলেবাসের পড়া আর শিক্ষকদের চিহ্নিত প্রশ্নগুলো পড়ে সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন ঠিকই, কিন্তু বইয়ের খুব কম বিষয়ই আত্মস্থ করতে পেরেছেন। উনাদের এই ধারনা টুকু নেই যে, নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ক্ষেপে যাননি, বরং মানুষের সাথে কোমল আচরণ করে এবং নরম সুরে কথা বলে মুমিন ছাড়াও সকল মুশরিকদের মন আকর্ষণ করেছেন; অবশেষে সে শ্রোতারা ইমান এই নে ধন্য হয়েছেন। যাহোক এই ভাবেই বিধানের ভিতরে বাহিরে মিলেই হয়তো গভীর রাত অথবা খানার ব্যবস্থা থাকলে শেষ রাত পর্যন্ত সভা চলতে থাকে।

মোট কথা হল, উনারা সিজনাল ধর্ম ব্যবসায়ী। তথ্যানুসারে অর্থের বিনিময়ে উকিল ব্যারিস্টার-গন আইনের সরবরাহ এবং তার উপস্থাপনের ফলে যদি তাদেরকে আইন ব্যবসায়ী বলা হয়, তাহলে যারা অর্থের বিনিময়ে ধর্মের বিধান সরবরাহ এবং তার উপস্থাপনের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করার সিজনাল পরিকল্পনা করে থাকে, তাদেরকে কেন ধর্ম ব্যবসায়ী বলা হবে না? এখানে আমি একটা উদাহরণ দিতে চাই, তাহলো কুকুর এবং গরু উভয় প্রাণীই গৃহপালিত পশু। প্রজননের উদ্দেশ্যে গরুর জন্য কোন সিজনের দরকার হয় না; কিন্তু কুকুরের প্রজননের জন্য সিজন বা কার্তিক মাসের দরকার হয়। তবে উভয় প্রাণীর মধ্যে সবাই জানে যে, গরু হল উৎকৃষ্ট পশু, আর কুকুর হল নিকৃষ্ট পশু। কাজেই প্রকৃত-মানের ইমানদার আলেমগণ কখনো সিজনের অপেক্ষায় থাকেন না। তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বদাই ধর্মের বিধান বিতরণ করে থাকেন। অপর পক্ষে নিকৃষ্ট মানের সিজনাল আলেমগণ শীতকালের অপেক্ষায় থাকে। আর সেই সময়ই হল তাদের ধর্মের নামে অর্থ উপার্জনের মূল সময়।

অতএব কথা হল, যত লোক সভায় এই সেছিল, তার এক দশমাংশ, এক বিশমাংশ, অথবা এক চল্লিশাংশ লোকও ফজরের নামাজে হাজির হয়েছিল কি-না, এই ব্যাপারে ওয়ায়েজিন গনের চিন্তা করার কোন সময় তাকে না, কারণ: তার বক্তৃতা শেষ হলে শুধু মাত্র বাকি থাকে তার মজুরী হিসাবে ওয়াদা কৃত টাকাটা পাওয়া। তিনি তো আর লোককে নামাজ পড়ানোর জন্য আসেননি, তিনি এই সেছেন বক্তৃতা দেয়ার জন্য এবং সে সাথে কিছু টাকা উপার্জন করার জন্য। বক্তৃতা দেয়া শেষ, তার দায়িত্বও শেষ। একবার ভেবেই দেখুন, রাত তিন টা পর্যন্ত যদি বক্তৃতা চলে এবং কোন লোক তা শোনে, তাহলে সে লোক কিভাবে ফজরের জামায়াতে শামিল হবে?  আর যিনি ওয়াজ করেন, তিনিই বা কিভাবে তাহাজ্জুদ পড়বেন অথবা ফজরের নামাজ জামায়াতে পড়বেন?  এরই উপর ভিত্তি করে ‘কিমিয়ায়ে সায়াদাত’ তৃতীয় খণ্ডের ওয়াজ অধ্যায়ে ওয়ায়েজীন সম্বন্ধে এত দুঃসংবাদ শুনানো হয়েছে। কারণ: তাদের কথার সাথে আমলের তেমন কোন মিলই থাকেনা। কিমিয়ায়ে সায়াদাতে আর একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে তাহলো, “দোযখের মধ্যে এমন একটি যায়গা আছে, যেখানে শুধুমাত্র আলেম ছাড়া কেউই স্থান পাবে না”।

প্রশ্ন হল, জন্মের পরের দিন থেকে যদি আল্লহর আদেশে বয়স পেয়ে কিয়ামত পর্যন্ত কেউ সভা শুনে, তাহলে একদিনের ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণ হবে কি?  উত্তর হবে, কখনোই না। প্রসঙ্গ ক্রমে বলা যায়, সিনেমা হলের নায়ক-নায়িকাদের অভিনয় দেখে মানুষ কখনো কাঁদে আবার কখনো হাসে, এই ভাবে কয়েকদিন পরে ভুলে যায়। ঠিক বক্তাদেরও সুরেলা বক্তৃতা শুনে মানুষ কখনো হাসে আবার কখনো কাঁদে এবং কয়েক দিন পরে ভুলে যায়। একটু হিসাব করে দেখুন, যে এলাকায় যে কয়টি সভা হয়েছে, সব মিলিয়ে সে কয়জন নতুন লোক কি সে বৎসরে নামাজী হয়েছে?  অবশ্যই হয়নি। এর মুখ্য কারণ হল টাকা দিয়ে গোলাম কেনা যায়, ধর্ম কেনা যায় না। যারা তাকওয়ার পাগল না হয়ে বরং হয় টাকার পাগল, তাদের কথা শুনে কোন লোক ধর্মের পথে আসতে পারেনি এবং কিয়ামত পর্যন্ত পারবে না। কাউকে কোন কথা বলতে হলে প্রথমে নিজেকে সে বিষয়ের উপর আমল করতে হয়। তাহলেই কেবল সে বিষয়টির প্রতিক্রিয়া শ্রোতার আমলে আসে, নচেৎ নয়। আমার বলার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের সকল ওয়াজ মাহফিল বা ওয়ায়েজীন ভুল পথে আছেন।   

উদাহরণস্বরূপ বর্তমান সময়ে মোবাইল একটি সাধারণ সামগ্রী হয়ে গেছে, যা কি-না অধিকাংশ মানুষের কাছেই আছে। রাস্তায় বা স্থিতিশীল অবস্থায় আমরা অনেক সময়ই তাদের মোবাইলে হয়তো বিখ্যাত শিল্পীর গান নয়তো কোন সুরেলা কণ্ঠের ওয়াজ শুনতে পাই। অথচ দেখা যায় তারা দৈনন্দিন নামাজতো দুরেই থাকুক সপ্তাহেও একদিন নামাজের ধারে-কাছেও যায় না। তারা মনে করে যে, গান শুনে যদি গুনাহ হয়, তাহলে তার পাশা-পাশী কিছু ওয়াজ শুনলে নেকী হয়ে যাবে। অর্থ হল + – ০। অথচ কোন ব্যক্তি যদি মন থকে একবার ‘সুবহান আল্লহ’ বলেন, তার বিপক্ষে কোন লোক কিয়ামত পর্যন্ত ওয়াজ শুনলেও কি সেই সুবহান আল্লহের সমান ছওয়াব হবে? মাননীয় ওয়ায়েজীন সাহেবরা বক্তব্যে বলেন যে, “যে সকল মা বোনেরা পর্দার ভিতরে আছেন………ইত্যাদি”। আমার প্রশ্ন হল ওয়াজের মধ্যে বলা হচ্ছে টি ভি দেখা জায়েজ নেই, তাহলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উনাদের ওয়াজ কেন বাহিরে প্রচার হতে দিচ্ছেন? কেনইবা জলসার পাশেই মহিলাদের স্বচক্ষে দেখার জন্য ব্যবস্থা করার অনুমতি দিচ্ছেন? ওনাদের চেহারা দেখাই বেশী দরকার না উনাদের বক্তব্য শোনা বেশী দরকার? উনাদের ছবি কি মহিলাদের জন্য দেখা জায়েজ আছে? তাহলে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদেরকে আব্দুল্লাহ ইবনে মাখতুম নামক অন্ধ সাহাবি থেকে পর্দা করতে বলেছিলেন কেন? তিনি কি বলেননি যে, “আব্দুল্লাহ অন্ধ কিন্তু তোমরা-তো অন্ধ না। তাই তোমরা তাকে পর্দা কর”? কাজেই আগে বক্তাকে সংশোধিত হয়ে তারপর স্রোতাদেরকে সংশোধন করতে হবে। তাহলেই কেবল উপদেশের স্থায়ী আলামত স্রোতাদের মধ্য বাস্তবায়িত হবে।

আবার ওয়ায়েজীনদের সে কি ডিগ্রী! সেগুলো মাইকে শুনতে শুনতে কান ঝালা পালা হয়ে যায়। বলুন-তো ডিগ্রী বেশী হলেই কি তার দাম বেশী হবে?  তাহলে নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে আবু হাকাম তথা আবু জাহেলের চেয়ে কি কারো ডিগ্রী বেশী ছিল, তার থেকে কি কেউ ভাল তাফসীর করতে পারতো?  যেহেতু সে জানতো সবার চেয়ে বেশী কিন্তু মানত না, তাই সে ছিল সবার থেকে নিকৃষ্ট ব্যক্তি। শয়তানের চেয়ে বেশী ডিগ্রী আল্লহর সৃষ্টিতে কারো নেই। আর আল্লহর সৃষ্টিতে সব থেকে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হলে শয়তান। লিফলেটে না হয় ডিগ্রী/ডিগ্রীগুলো লিখেছে তাদের একটা পরিচিতির জন্য, সেটা আলাদা ব্যাপার, মাইকেও কি এত বেশী বলতে হবে?  আবার দেখা যায় যে বাড়িতে তারা জন্ম গ্রহণ করেন, সেখানেই সারা জীবন অবস্থান করা সত্ত্বেও তাদের নামের পূর্বে ‘হযরত’ ব্যবহার করা হয়। হয়তো আলেমদের কাছে এই উপাধি শুনতে ভালই লাগে, তাই তারা কিছু বলেন না অথবা ‘হযরত’ কাকে বলে, তাই বুঝেন না। আমি ভারত, পাকিস্তান সহ আমাদের দেশের বেশ কিছু দীনি আলেমের বক্তৃতা শুনেছি, তাদের বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে যে, আল্লহর পক্ষ থেকে নূর ঝড়ে পরছে। তাদের কথায় মানুষের ইমান পাকা হতে বাধ্য। তারা কখনো বেশী রাত করে ওয়াজ করেননা, বরং সে সময় আল্লহর সান্নিধ্য লাভের আশায় তাহাজ্জুদে কাটায়। কাজেই মনে রাখবেন, আল্লহর কাছে মানুষের মর্যাদা ডিগ্রীতে নয়, মর্যাদা হল তাকওয়া বা আল্লহ ভীতিতে।

দেখা যাক ইছালে ছওয়াব বা খানার প্রসঙ্গ। যখন খানা শুরু হয়, মানুষ সভাস্থলে থাকুক আর নাই থাকুক, তখন কিন্তু ঠিকই সবাই হাজির হবে। তার পরে শুরু হবে গীবত “ওর আত্মীয়কে ও বেশী দিল, আমি শুধু হাড় পেলাম, ও দুই জনের খাদ্য নিল, যারা বণ্টন করছে ওরা আগেই মাংস লুকিয়ে রেখেছে, ওদের লুকানো মাংস পরে বাড়ি নিয়ে যাবে অথচ আমরা ভাগই পেলাম না”, ইত্যাদি ইত্যাদি। তার পরই শুরু হবে সভার টাকার হিসাব। কত ফান্ডে যে কত টাকা বাদ যাবে, তার তো কোন ইয়ত্তাই নেই। যাহোক মসজিদ মাদ্রাসারও কিছু থাকবে। মোট কথা হল বর্তমানে বেশীর ভাগ সভা হল পেশাদার হুজুরদের সিজনাল ব্যবসা। সে সাথে মসজিদ- মাদ্রাসার দুনিয়াবি উন্নয়ন এবং কমিটির হিসাবের খাতা হারানোর জন্য একটা বিশেষ ব্যবস্থা। যার কারণে মসজিদে মোজাইক বা টাইলস হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নামাজীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। কারণ সভা করার পূর্ব মুহূর্তে মানুষের ইমানের বৃদ্ধি বা নামাজী বৃদ্ধির কোন নিয়তই থাকেনা। বরং নিয়ত থাকে মসজিদ অথবা মাদ্রাসার উন্নয়নের। কাজেই আল্লহ তার বান্দার নিয়তের উপরই কর্মফল নির্ধারণ করে দেন।

মোট কথা হল, যত কৌশলেই টাকা বা চাঁদা আদায় করা হোক না কেন, যদি তা হালাল উপার্জনের না হয়, তাহলে সে টাকা কোন অবস্থায়ই গ্রহণ করা যাবে না। তবে যদি সেটা অমুসলিম দেশে হয় এবং তার টাকার মধ্যে হারাম-হালাল সবই মিশ্রিত থাকে, তাহলে সে টাকা বিশেষ মুহূর্তে গ্রহণযোগ্য হবে। তাছাড়া মুসলমান অধ্যুষিত স্থানে কখনই হারাম-তো পরের কথা, বরং হারাম-হালাল মিশ্রিত উপার্জনকারীর টাকা গ্রহণও জায়েজ নয়। প্রয়োজনে যে এলাকায় মসজিদ নির্মিত হবে, সে মহল্লার লোকজনদের সহযোগিতায় ছোট করে মসজিদ নির্মাণ করাই উত্তম। তবে সে এলাকায় যদি কোন ব্যবসায়ী মহল থাকে, তাহলে তাদের নিকট থেকে টাকা গ্রহণের জন্য দাবি করা যাবে। তাই বলে হারাম উপার্জনের ব্যবসায়ীকে মোটেও দাতার সারিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

ছোটবেলায় ঈশ্বরদীতে অনেক দরিদ্র বিহারীকে সর্ব সাকুল্যে ৩০-৪০ টাকার সামগ্রী নিয়ে পলিথিন কাগজের একটু ছায়লার মত করে দোকান করতে দেখেছি। তখন চিন্তা করেছি যে, এই দোকানে কয় টাকা-ই লাভ হতে পারে?  আসলে ব্যাপারটি অনেক পরে নিজ থেকেই বুঝতে পেরেছি। তাহলো তারা অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় ছোট বেলা থেকেই সন্তানদের শিক্ষা দেয় পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করার জন্য। যাতে সে ছোট বেলা থেকেই অপরের কাছে হাত পাততে না শিখে। আর এই রূপ পরিশ্রমের ফলেই তাদের দ্বারা লাচ্ছা সেমাই, আতসবাজি সামগ্রী, কাগজ ও কাপড়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সাজ-সজ্জার সামগ্রী সহ প্রচুর জিনিস আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে এবং হচ্ছে। অপর পক্ষে আমাদের কোমল মতি শিশুদেরকে মাদ্রাসায় দেয়ার পর তাদেরকে পাঠানো হয় বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সংগ্রহের জন্য। সেখানে প্রথমেই শিক্ষা দেয়া হয় যে, মানুষের কাছে ধর্মের দোহাই দিয়ে হাত পাতলেই টাকা পাওয়া যায়; যদিও সেখানে অনেক মধ্যবিত্ত উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানও থাকে, যাদের পিতা-মাতা অন্যদেরকে সাহায্য দেয়। রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় যেখানে নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাতকে উত্তম বলেছেন, সেখানে কোমল মতি শিশুদেরকে কিভাবে নিচের হাতের শিক্ষা দেয়া হয়, তা আমার মোটেও বুঝে আসে না। হয়তো এই উচিত কথার বিপক্ষে অনেক কৌশলী উত্তর পাওয়াটাই স্বাভাবিক?

আভিধানিক ভাবে উল্লেখিত অর্থ প্রাপ্তির ব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যেই পরে। আর কিভাবে পরে তা ব্যাখ্যা করা জরুরী বলে মনে করি। অন্য যে কোন মানুষের কাছে থেকে পাওয়ার মত মূল বিষয় হল দুইটি। যেমন:

১) সাহায্য (Help)

২) সহযোগিতা (Co-operation)

সাহায্য আছে আবার দুই প্রকারের। যথা: ১/ক) ভিক্ষা (Beg) এবং ১/খ) সমর্থন (Support)

সহযোগিতা আছে আবার পাঁচ প্রকারের। যথা: ২/ক) উপঢৌকন (Presentation), ২/খ) উপহার (Gift), ২/গ) স্বেচ্ছায় দান (Willingly help), ২ঘ) ঋণ (Lone), এবং ২/ঙ) দান (Donate)

১/ক) ভিক্ষা (Beg): কারো কাছে যখন কোন জিনিস না থাকে, তখন কোন বিনিময় প্রদান ছাড়াই ফেরত দিতে পারবেনা মর্মে সেই জিনিস অন্যের কাছে থেকে সাহায্য পাওয়ার নিয়মকেই বলে ভিক্ষা (Beg)। যেমন: ভিক্ষা করা।

১/খ) সমর্থন (Support) : কারো কাছে যদি কোন কর্মের অংশ বিশেষ সম্পন্ন করার মত ক্ষমতা থাকে, তাহলে পুরো বিষয়টি সম্পন্ন করার জন্য অন্যের থেকে আংশিক সাহায্য গহন করার নিয়মকে বলে সমর্থন (Suppor)। যেমন: একটি ঘড়ির দাম ১০০ টাকা। কোন ব্যক্তির কাছে ৮০ টাকা আছে, সেই ক্ষেত্রে তার এক বন্ধু কোন প্রকার বিনিময় সর্ত ছাড়াই তাকে বাকি ২০ টাকা দিয়ে সাহায্য করল।

২/ক) উপঢৌকন (Presentation) : কোন ব্যক্তির বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে সেই ব্যক্তি কর্তৃক জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে তার চাওয়া ছাড়াই তাকে যে সামগ্রী প্রদান করার নিয়মকে উপঢৌকন (Presentation)। যেমন: কারো ছেলের বিয়ে উপলক্ষে দাওয়াত পাওয়াতে তাকে কিছু দেয়া।

২/খ) উপহার (Gift) : কোন ব্যক্তির চাওয়া ব্যতিরেকে এই কান্তই নিজের ইচ্ছায় কোন বিনিময় ছাড়াই বিশেষ কোন সামগ্রী কাউকে দেয়ার নিয়মকে বলে উপহার (Gift)। যেমন: একজন বিদেশ থেকে এই সে কাউকে একটি জায়নামাজ দিল।

২/গ) স্বেচ্ছায় দান (Willingly help) : কেউ নিজে থেকে দেখতে পাচ্ছে যে, অপর এক ব্যক্তি সমস্যায় আছে, কিন্তু সে কোন সাহায্য চাচ্ছে না তবে দিলে নিবে। সেক্ষেত্রে কাউকে কিছু দেয়ার নিয়মকে বলে স্বেচ্ছায় দান (Willingly help)। যেমন: কোন ছাত্র বই কিনতে না পারায় অন্য একজন তাকে আর্থিক সাহায্য করল।

২ঘ) ঋণ (Lone) : নিজস্ব প্রয়োজন সম্পন্ন করার জন্য পরবর্তীতে পরিশোধ করার চুক্তিতে অপরের কাছে থেকে যে সহযোগিতা পাওয়া যায়, তার নিয়মকে বলে ঋণ (Lone)। যেমন: কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারো কাছে থেকে ৩০০ টাকা ঋণ নিয়ে একটি শাড়ি কিনল, যা আবার পরে ফেরত দিতে হবে।

২/ঙ) দান (Donate) : কোন আলোচিত/অনালোচিত বিষয়ে কারো কোন চাপ বা বিনিময় ছাড়াই স্ব-ইচ্ছায় নিজে থকে কোন কিছু কাউকে দেয়ার নিয়মকে বলে দান (Donate)। যেমন: কোন ব্যক্তি মসজিদের জন্য এক বিঘা জমি দান করল বা কাউকে একটা রিক্সা কিনে দিল।

অতএব বর্তমানে যে পদ্ধতিতে মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য সাহায্য তোলা হয়, তাকে কোন আভিধানিক ভাষায় আপনি নিতে পারবেন, সে সিদ্ধান্তটি আপনার উপরেই ছেড়ে দিলাম। সে সাথে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবি, তাবেয়ি এবং তাঁবে-তাবেয়িগন মসজিদের উন্নয়ন তথা আধুনিকায়নের জন্য কারো কাছে কোনদিনের জন্যও একটি টাকা সাহায্য চেয়েছেন কি-না। যদি সাহায্যই চাইতেন, তাহলে আল্লহর রসুলকে মসজিদের নির্মাণের কাজ সবার সাথে স্বহস্তে করতে হতনা। তিনি ইচ্ছা করলে সাহাবীদের টাকা দিয়ে হেরেম শরিফ এবং মসজিদে নববীকে সোনা-রোপার মোড়কে আচ্ছাদিত করতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি না করে বরং নির্দিষ্ট এই লাকার সবাইকে সশরীরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মসজিদের কাজে সহযোগিতা করতে শিখিয়েছেন। যার উদাহরণ আমরা হাদিসের তথ্যভাণ্ডারের মসজিদ নির্মাণ বিষয় থেকে জানতে পারি।

একথা নিশ্চিতভাবে সত্য যে, বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য কওমি বা খারেজী মাদ্রাসা-ই সুন্নতের আমলকে টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তবে সেই নামের ছায়াতলে এমন কিছু মাদ্রাসা আছে, যেগুলো যুগ-যুগ আগে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও অবকাঠামোর দিক দিয়ে হয়তো টিনের ছাপরার যায়গায় এখন দালান হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মানের কোন পরিবর্তন-ই হয়নি অথবা এধরনের কোন চিন্তা-ভাবনাও দেখা যায় না। আসলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার জন্য যে পরিমাণ মাদ্রাসা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশী দরকার হল মৌলিক-ভিত্তিক মকতব শিক্ষার ব্যবস্থা। আর সেই জন্য প্রতিটি এলাকার মসজিদের মধ্যেই বাধ্যতামূলকভাবে এই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকা উচিৎ। এরূপ মকতব শিক্ষা ব্যবস্থা চালু না থাকার ফলে আজকের মানুষ আধুনিক শিক্ষায় অনেক অগ্রসর হওয়া সত্ত্বেও মুসলমান হিসাবে সকল কাজের শুরুতে যে কথাটি বলতে হয়, অর্থাৎ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’এই বাক্যটিই শুদ্বরূপে বলতে পারে না। তাহলে সেই শিক্ষিত ব্যক্তি অন্য উচ্চারণ করবে কিভাবে?  যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islamqa.com/en/ref/39661/gift

http://www.islamqa.com/en/ref/44738/bid’ah

http://www.islamicity.com/qa/action.lasso.asp? -db=services&-lay=Ask&-op=eq&number=1274&-format=detailpop.shtml&-find

http://www.islamicity.com/qa/action.lasso.asp? -db=services&-lay=Ask&-op=eq&number=3043&-format=detailpop.shtml&-find

You may also like...