নামাজের সময় যত্র-তত্র চেয়ারের ব্যবহার করা

বর্তমানে বিশেষ করে শহরের প্রায় প্রতিটি মসজিদেই চোখে পরার মত একটি বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা আগে তেমন ছিল না। তাহলো মসজিদের ভিতরে বাহুল্য পরিমাণ চেয়ারের সমাবেশ। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যক্তিগণ জানেইনা যে, তার দ্বারা চেয়ারে বসে নামাজ পড়া যাবে কি-না অথবা তার ওজরটি চেয়ারে বসার মতন যোগ্যতা রাখে কি-না। আমি রাজধানীর একটি মসজিদ তথা মিরপুর ১০ নাম্বারের ফকির বাড়ির মসজিদে প্রায় ৩০ বৎসর পূর্বেও নামাজ আদায় করেছি; কিন্তু তখন সেই মসজিদে একটা চেয়ারও ছিল না। গত মাসে সেই মসজিদে নামাজ পড়তে যেয়ে নিচ তলায়ই প্রায় দুই ডজনের মত চেয়ার দেখেছি। আবার কোন কোন চেয়ারের সামনে টেবিলও দেখেছি। আসলে অবাক লাগে এই ভেবে যে, যেখানে দিনে দিনে মানুষ ধর্ম সম্বন্ধে অধিক জানা এবং আমল করার কথা, সেখানে তারা দিনে দিনে মানুষ বিভিন্ন ওজর বের করে দিন দিন পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে অবশ্য আমি সবথেকে বেশী দায়ী করব সেই সকল ইমাম সাহেবদেরকে, যারা দৈনন্দিন এবং বাস্তবমুখী আমলের প্রকৃত শিক্ষা না দিয়ে খুতবা প্রদানের সময় ব্যাপক-ভিত্তিক আলোচনা রাখেন, যে বিষয়গুলো সাধারণ অল্প ধর্মীয় জ্ঞান সম্পূর্ণ মানুষদের জন্য বুঝা এবং আমল করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য এরূপ বক্তৃতার মাধ্যমে সেই ইমাম সাহেব সমাজের কাছে খুব জ্ঞানী হিসাবে বাহবা পেয়ে থাকেন; অথচ এখানে মুত্তাকীগণ হয়ে থাকেন সর্বদায়ই উম্মি বা ধর্মীয় জ্ঞানে একেবারে অপরিপক্ব। ব্যাপারটি এমন যে, একজন ৩য় শ্রেণীতে পড়া ছাত্রের কাছে দ্বাদশ শ্রেণীর বই সম্বন্ধে বক্তৃতা দেয়া হচ্ছে, যা তার দ্বারা মোটেও আত্মস্থ করা সম্ভব নয়। কাজেই যে ব্যক্তি ধর্মের মূল বিষয়গুলোই জানেন না, তাকে বিশাল বিষয় শুনানো মানেই নিজের বাহাদুরি জাহির করা ছাড়া আর কিছুই না। বরং সকল ক্ষেত্রেই আগে মৌলিক বিষয়গুলো মুসুল্লিদেরকে শিক্ষা দেয়া উচিৎ।

একটা কথা সর্বদায়ই মাথায় রাখতে হবে যে, যে ব্যক্তি দাড়াতে পারে, তার জন্য কোন অবস্থায়ই ফরজ-ওয়াজিব নামাজ বসে পড়া জায়েজ নেই। তবে সুন্নত- নফল নামাজ বসে আদায় করা যাবে কিন্তু সেই ক্ষেত্রে ছওয়াব পাওয়া যাবে অর্ধেক। পাক কালামে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন যেমন দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন, যেমন “হে রসুল আপনি উঠুন ও দণ্ডায়মান হওন”। তেমনি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় সংক্রান্ত সমস্যার একটি উত্তরে আল্লাহর রসুল বলেছেন, “যদি কোন মানুষ অসুস্থ হয় এবং ভ্রমণ করে, তার জন্য একই আদেশ বলবত থাকবে যেভাবে সে সুস্থ এবং ভ্রমণ-বিহীন অবস্থায় আমল করতে (নামাজে) অভ্যস্ত ছিল”। সকল স্কলারেরই একই মত, তাহলো যদি কোন ব্যক্তি দাড়াতে সক্ষম থাকা স্বত্বেও বসে (ফরজ-ওয়াজিব) নামাজ আদায় করে, তাহলে তার নামাজ বাতিল হিসাবে গণ্য হবে। তবে মানুষের সমস্যা থাকতেই পারে সেক্ষেত্র অবশ্যই বসে নামাজ আদায় করতে পারবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার জন্য কিছু নিয়ম বা সর্ত আছে, যা নিম্নে দেয়া হল।

১। যে ব্যক্তি হেটে মসজিদে যেতে পারে এবং দাঁড়িয়ে থাকতে পারে অথবা বসা-উঠাতে সমস্যা না হয়, তার জন্য চেয়ারে বসে নামাজ আদায় বৈধ নয়।

২। কোন ব্যক্তি যদি দাড়াতে পারে কিন্তু রুকু-সেজদা না করতে পারে, সেক্ষেত্রে সে নামাজের সময় দাঁড়িয়ে নামাজ সম্পন্ন করবে এবং রুকু সেজদার সময় চেয়ারে বসবে। রুকুর সময় হাত বাহুর উপরে রাখলেও সেজদার সময় আরও একটু সামনে বা নিচে নিতে হবে। এক্ষেত্রে নিজের পা জামাতের সারির সাথে মিল রেখে চেয়ার নামাজের সারি থেকে পিছনে রাখতে হবে। এধরনের ওজরে চেয়ার নামাজের সারির মধ্যে না রেখে বরং এক কিনারে বসানোই উত্তম। এমতাবস্থায় সারির মধ্যে চেয়ার থাকলে পিছনের ব্যক্তির অবশ্যই সেজদা দিতে অসুবিধা হবে।

৩। যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না বা বসা-উঠা করতে পারে না, সেই ব্যক্তি প্রথমেই চেয়ার বসবে। এক্ষেত্রে তার চেয়ারের পিছনের পায়া নামাজের সারির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে হবে।

৪। চেয়ারে নামাজ আদায়-কালে কোন অবস্থায়ই সে সেজদা দেয়ার জন্য টেবিল ব্যবহার করতে পারবে না এবং ইজি চেয়ার নিয়ে হেলান দিয়ে বসে নামাজ আদায় করতে পারবে না।

৫। দাড়িয়ে নামাজ আদায়ে অক্ষম অন্তঃসত্ত্বা মহিলা-গণ নামাজ আদায় কালে সেজদার জন্য বালিশ ব্যবহার করে থাকে। এক্ষেত্রে নামাজের জন্য কোন বালিশ ব্যবহার না করে বরং সরাসরি বসে নামাজ আদায় করতে হবে এবং সেজদার সময় রুকুর চেয়ে হাতকে একটু সামনে নিতে হবে। চেয়ারে না বসে ফ্লোরে নামাজ আদায় করলে সেজদা-কালে হাত ফ্লোরে রাখা উত্তম। এমতাবস্থায় সেজদার জন্য কোন বালিশ বা টেবিলের প্রয়োজন নেই।

৬। যার শুধুমাত্র দাড়াতে না পারাই সমস্যা কিন্তু যেকোনো স্থানে বসতে অসুবিধা নেই, তার জন্য চেয়ারের হাতার সাহায্য নেয়া বা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা মোটেও বৈধ নয়। সে ধরনের লোকদের জন্য মোড়া বা টুলের ব্যবস্থাই উত্তম। আর যদি সে পা ভাজ করে ফ্লোরে বসে নামাজ আদায় করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটিই হল বসে নামাজ আদায় করা ব্যক্তিদের জন্য সর্বোত্তম।

কাজেই আমরা প্রয়োজনের বাহিরে কোন অবস্থায়ই যেন চেয়ারে বসে নামাজ আদায় না করি, সেদিকে লক্ষ্য রাখি। আর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া চেয়ার ব্যবহার না করে বরং মোড়া বা টুল ব্যবহার করা উচিৎ। এতে হেলান দেয়ার কোন সুযোগ থাকে না। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islam-qa.com/en/50684 

http://www.islam-qa.com/en/ref/9307 

http://www.islam-qa.com/en/ref/36738 

You may also like...