ফাতিহা পাঠ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করা

ফাতিহা পাঠ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করা

ফাতিহা নামাজে পড়ার নৈতিকতাঃ

পাক কালামে আল্লহ বলেন, ”তোমাদের সামনে যখন কোর’আন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা শ্রবণ কর”। সে হিসাবে পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে, কারো সামনে কোর’আন তিলাওয়াত করা হলে বা কেউ কোর’আন তিলাওয়াত শুনলে তা শ্রবণ করা ওয়াজিব। তাহলে যে সকল নামাজে সরবে কুর’আন তিলাওয়াত করা হয়, সে সকল নামাজ সমূহে মুক্তাদি হিসাবে কোন অবস্থায়ই নিজে নিজে ইমামের পিছনে কুর’আন তিলাওয়াত করা উচিৎ নয়। এমতাবস্থায় আহলে হাদিস গন উল্লেখিত আল্লহর আদেশের বিপরীত করে থাকে। অপর দিকে আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ”কেউ সালাত আদায় করল কিন্তু সে তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তবে তার সালাত ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হবে”। একথা তিনি তিনবার বলেছেন। আবু হুরায়রা (রা:) কে তখন বলা হল, “আমরা অনেক সময় ইমামের পিছনে থাকি”। তিনি বললেন, “তখন তুমি তা মনে মনে পাঠ করবে”। উল্লেখিত হাদিসের তথ্যানুসারে নামাজে সূরা পড়া বাধ্যতা মূলক।

আবু হুরায়রা (রা:) ই অপর হাদিসে বলেন, ”নবী সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন গইরিল মাগ্‌দু-বি আলাইহীম ওয়ালাদ্দ-ল্লী’ন পাঠ করতেন তখন বলতেন “আমীন”। এমন কি প্রথম কাতারে যারা তাঁর পিছনে নিকটবর্তী থাকতেন, তাঁরা (সে আওয়াজ) শুনতে পেতেন”। এখানে দেখা যায় ওনারা নামাজে নীরবে নবী সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিলাওয়াত শুনতেন। যার কারণে শুধুমাত্র সামনের সারির কিছু সাহাবী সে আমি’ন উচ্চারণ শুনতে পেতেন। অর্থাৎ ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পড়া ঠিক নয়। একটু চিন্তা করলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, উনি দুই রকম হাদিস কেন বললেন, এবং সে সাথে আরও পরিষ্কার হবে যে উনার বলাতে কোন ভুল নেই; ভুল আছে আমাদের বুঝার বিষয়ে।

অন্যত্র তিলাওয়াত সংক্রান্ত হাদিসে আছে, ”কোর’আন তিলাওয়াত কারী এবং শ্রবণ কারী উভয়ের জন্য একই ছওয়াব” সে হিসাবে যে সকল নামাজে ইমাম কর্তৃক সূরা সরবে তিলাওয়াত করা হয়, সেখানে নাহয় মুক্তাদি-গন নীরব থেকে সুরা ফাতিহা শ্রবণ করবে, কিন্তু যে সকল নামাজে ইমাম কর্তৃক সুরা ফাতিহা নীরবে তিলাওয়াত করা হয়, সেখানে উপরের হাদিসের তথ্যানুসারে অবশ্যই মনে মনে সুরা ফাতিহা পাঠ করা উচিৎ। এখানে হানাফি মযহাবের সদস্য গন উল্লেখিত হাদিসের বিপরীত করে থাকেন।

আমাদের হানাফি মজহাবের কিছু আলেম আবার বলে থাকেন যে, “ইমামের পিছনে থেকে যে কোন কার্যক্রম যদি ইমামের আগে করে থাকে, তাহলে তাহলে তার নামাজ-তো হবেই না বরং হাদিসের তথ্যানুসারে কিয়ামতের দিন তাদের কে গাধার আকৃতি ধারণ করে উঠানো হবে। সুতরাং সুরা ফাতিহা মনে মনে পড়ার সময় যদি ইমামের আগেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে সে অবশ্যই উপরে বর্ণিত হাদিসের ক্ষতির সম্মুখীন হবে”। আসলে আমি তাঁদেরকে বলতে চাই যে, এই হাদিসটি হল নামাজের রোকন গুলো আদায় করা সম্বন্ধে। তাদের যুক্তির বিপরীতে আমার প্রশ্ন হল, একমাত্র সুরা ফাতিহা ছাড়া তো বাকি সব বিষয় গুলো মুক্তাদি গন ইমামের পিছনে পড়ে থাকে।

যেমন আত্তাহিয়াতু, দরুদে ইব্রাহীম, দোয়া মাছুরা, রুকুর তাসবীহ, ছানার তাসবীহ, তাকবীর সহ সকল দোয়া সমূহই ইমামের পিছনে প্রায় সকল মানুষ পড়ে থাকে, তখন কি সেগুলো ইমামের পূর্বেই অনেক সময় শেষ হয় না?  তাছাড়া এই গুলো ইমামের পিছনে পড়ার জন্য সরাসরি কি কোন হাদিস আছে?  তাহলে সেগুলো আদায় করলে আমাদের কোন সমস্যা হয় না, কিন্তু যে বিষয়টি একজন বিখ্যাত সাহাবী (আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত আছে, সে বিষয়ের বিপরীতে যে কোন মতামত প্রদান করতে আমাদের কোন দ্বিধা আসে না কেন?  আমরা কি তাঁর চেয়ে বেশী বুঝি?  (নাউজুবিল্লাহ)।

এই বিষয়গুলো নিয়ে ইতিপূর্বে ফকিহ-গন সুষ্ঠু সমাধান দিয়ে গেছেন। শুধুমাত্র আমরা গুমরাহীর জন্য নিজে যে আমলটা করি, ঠিক সেটি ছাড়া বাকী সবগুলোকে ভুল মনে করি। হানাফি মযহাবের যুগ-শ্রেষ্ঠ ফকীহ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (র:) সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন যে, “ফজর, মাগরিব এবং ঈশার নামাজে মুক্তাদি গন ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে না, বরং তা নীরবে শ্রবণ করবে; কিন্তু যোহর এবং আসরের নামাজে মুক্তাদি-গন ইমামের পিছনে নামাজের এক্তেদা করা সত্ত্বেও মনে মনে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে” (মেশকাত শরীফ)।

সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ কথা হল, সাহাবী (রা:) কর্তৃক বর্ণিত প্রত্যেকটি হাদিসের প্রতি আমাদের মূল্যায়ন করা উচিৎ। অতএব যে সকল তথ্য হাদিসে বর্ণিত আছে, এই ধরণের যে কোন আমলই যদি কেউ করতে থাকে, তাহলে তার বিপরীতে কোন মন্তব্য করা ঠিক নয়। বরং হাদিসে বর্ণিত সকল আমলই জীবনে কমপক্ষে একদিন আদায় করলেই প্রত্যেকটি হাদিস তথা সাহাবী (রা:) দেরকে সম্মান করা হবে। শুধুমাত্র নিজের আমলকেই সব সময় ঠিক মনে করে অন্যের আমলকে ভুল মনে করা উচিৎ নয়। আর সাহাবী (রা:) দেরকে সম্মান করা মানেই হল নবী সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সম্মান করা। যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন: –

http://www.islam-qa.com/en/ref/21717/faatihah

http://www.islam-qa.com/en/ref/74999/faatihah 

You may also like...