ফিতরা প্রদানে ‘মূদ’ বা ‘সা’ এর নীতিমালা না মানা

ফিতরা প্রদানে মূদ বা সা এর নীতিমালা না মানা।

ফিতরা প্রদানে হাদিসের নীতিমালা মানাই জরুরী

ফিতরা বা সাদাকাতুল ফিতর মানেই হল রমযান মাসের সাদকা। আর সাদকা মানে হল নিজের কাছে গচ্ছিত বা সঞ্চিত সম্পদ থেকে কোন প্রকার দুনিয়াবি স্বার্থ কামনা ছাড়াই অন্য দরিদ্র ব্যক্তিকে যতদূর সম্ভব দান করা। তবে সাধারণ সাদাকা আর রমজান মাসের সাদাকা বা সাদাকাতুল ফিতরের সাথে বেশ কিছু পার্থক্য বিদ্যমান আছে। সাদাকা কে দিবে এবং ( মোট সম্পদের এক তৃতীয়াংশের মধ্যে) কতটুকু দিবে তার কোন সীমা নেই, কিন্তু সাদাকাতুল ফিতরের বেলায় একটা সীমা নির্ধারণ করা আছে।

সাদাকা বৎসরের যে কোন সময় প্রদান করা যায়, কিন্তু সাদাকাতুল ফিতর শুধুমাত্র রমযান মাসেই প্রদান করতে হয়। সাদাকা প্রদানের বেলায় পরিবারের জনসংখ্যা গণনা করার কোন প্রয়োজন পড়ে না, কিন্তু সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করার বেলায় ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করার পূর্বে যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে, তারও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। কাজেই এখানে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।

ইসলাম ধর্মে একজন মানুষের জন্য কখন কি এবং কতটুকু দান বা প্রদান করতে হবে, তার প্রতিটি বিষয় বিশদভাবে বর্ণিত আছে। উদাহরণ স্বরূপ যাকাতের বেলায় পশু বা অর্থ, ওশরের বেলায় ফসল, সাদাকার বেলায় যে কোন কিছু দেয়ার অনুমতি রয়েছে। তেমনি সাদাকাতুল ফিতরের বেলায় খাদ্য সামগ্রী দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আসলে আমাদের আলেম সমাজ যদি সকল বিষয় নিয়ে সুন্নতকে অনুসরণ করতেন, তাহলে হয়তো মুসলমানদের মধ্যে আর এত ফেতনা ছড়িয়ে পড়তে পারতো না।

রসুল সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে ফকিহ করে দেন”। তিনি কিন্তু বলেননি যে, ”যে ব্যক্তি অনেক বড় বড় সার্টিফিকেটের অধিকারী বা দাড়ি, পাগড়ী, জুব্বা, টুপি, শেরওয়ানী ইত্যাদিতে দেখতে উচ্চ স্তরের মুসলমানের মতন দেখা যায়, তাকে আল্লহ ফকিহ করে দেন”। কাজেই আলেম ভাইদের আত্মহংকার না ভুলা পর্যন্ত মুসলমানদের কল্যাণ সম্ভব নয়। অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে থেকে ফিতনা দূর হওয়া সম্ভব না। অনেক ব্যক্তি মনে করেন যে, হাদিস নিয়ে নতুন কিছু গবেষণা করা উচিৎ না। কিন্তু আসল কথা হল, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তার সব কিছুই পরোক্ষভাবে হলেও কুর’আন- হাদিসে লিপিবদ্ধ আছে। সেগুলো শুধুমাত্র সময়সাপেক্ষে গবেষণা করেই মুসলমানদের বের করে নিতে হবে। আর এই গবেষণার কার্যক্রম কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।

ফিতরা প্রদানের মাপ কি হওয়া উচিৎ

যাহোক সাদাকাতুল ফিতরা প্রদানের সময় একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তাহলো ‘সা’ অর্থাৎ প্রতিজন সদস্যের জন্য এক ‘সা’ পরিমাণ ফিতরা আদায় করতে হবে। আমাদের জানা নেই যে, ‘সা’ কিন্তু কোন ওজনের একক নয় বরং মাপের একক। কাজেই যারা ওজন এবং মাপের মধ্যে পার্থক্য বুঝেন না, তাদের কাছে অবশ্য এটা আবার ঝামেলা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশেও এমন ধরনের কিছু মাপ প্রচলিত আছে। যেমন: হাতের মধ্য কোন কিছু নিয়ে আঙ্গুল বন্দ করার পরিমাণকে বলা হয় এক মুষ্টি, আবার এক হাতের পূর্ণ তালুকে খুলে তার মধ্যে যে পরিমাণ ধরে, তাকে বলা হয় এক চোল ইত্যাদি। ঠিক তেমনি আরবের নীতি অনুসারে দুই হাতের তালু একসাথে মিলেয় খোলা অবস্থায় যে পরিমাণ সামগ্রী ধরে, এমনি একটি মাপের পাত্রকে বলা হয় ‘মুদ’। আর চার মুদের সমপরিমাণ ধারণক্ষম পাত্রকে বলা হয় এক ‘সা’। কাজেই সকল ধরনের খাদ্য সামগ্রীর ফিতরার পরিমাণ এক ‘সা’ নির্ধারিত হলেও তাদের ওজন কোন অবস্থায়ই এক হওয়া সম্ভব না। অথচ আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে  ফিতরা বিবেচনা/ নির্ধারণ করা হয় ওজন দিয়ে।

রসুল সল্লাল্ল-হু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন ক্ষেত্রেই অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায়ের কথা বলেননি। এধরনের একটা হাদিসও নেই। তিনি সব সময় খাদ্য সামগ্রী দিয়ে ফিতরা আদায় করতে বলেছেন। তবে কথা থাকে যে, যে সকল এলাকায় সরাসরি ফিতরা প্রদানের মত তেমন কোন গরীব মানুষ না পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে অবশ্য সেই ব্যক্তি যে মানের খাদ্য সামগ্রী ভোগ করে, সেই মানের এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্য সামগ্রীর সমপরিমাণ মূল্য দেশ-বিদেশে বা অন্যত্র দরিদ্র মুসলমানদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একইরূপ নীতিমালায়ই কিন্তু আমাদের দেশের দরিদ্র মুসলমান-গন আরব দেশের কুরবানির মাংস পেয়ে থাকে।

কি দিয়ে ফেতরা পরিশোধ করা উচিৎ

অপরপক্ষে আমাদের আশে পাশেই অনেক দরিদ্র মানুষ থাকাতে সেই মাংস অন্যত্র পাঠানোর কোন প্রয়োজন পড়ে না। অথচ আমাদের দেশের আলেম সমাজ এক চেটিয়াভাবে সকল ফিতরা টাকা দিয়ে পরিশোধ করার নির্দেশ কিভাবে দিয়ে থাকেন, তা তারাই জানেন। নিয়মানুসারে কেউ যদি ইরি ২৮ চালের ভাত খায়, তাহলে তাকে সেই মানের চালেরই এক ‘সা’ দান করতে হবে। আর কেউ যদি বাসমতী চালের ভাত খায়, তাহলে তাকে সেই মানের চাল দিয়েই ফিতরা পরিশোধ করতে হবে। তবে বাসমতী চাল খাওয়া মানুষের বেশীরভাগই এখন শহরে বাস করে, কাজেই সেক্ষেত্রে যদি তারা নিকটে কোন দরিদ্র মানুষ তারা না পায়, তাহলে অবশ্যই সেই হিসাবে এক সা চালের টাকা জনপ্রতি ফিতরা হিসাবে দান করতে হবে। কিন্তু দরিদ্র মানুষ পাওয়া গেলে সেখানে টাকা দেয়ার কোন প্রশ্নই আসে না।

এখানে একটি বিষয় বুঝতে হবে, তাহলো আরবের জন্য তদানীন্তন সময়ে খেজুর, কিসমিস, আঙ্গুর ইত্যাদি ফল খাদ্য সামগ্রী হিসাবে অত্যন্ত সহজ লভ্য ছিল। সেক্ষেত্রে গম বা যবের যোগানই ছিল কঠিন। যেমন আমাদের দেশে বর্তমান যে পরিমাণ যব উৎপাদন হয়, তা দিয়ে ৬৮,০০০ গ্রামের মধ্যে থেকে একটি গ্রামের মানুষের ফিতরা প্রদানও সম্ভব না। কাজেই সাদাকাতুল ফিতরা যা-ই আদায় করা হোক না কেন, অবশ্যই তা কোন খাদ্য সামগ্রী হতে হবে এবং সেটা সেই সামগ্রী দিয়েই সরাসরি পরিশোধ করতে হবে। আর সরাসরি পরিশোধ করার মত দরিদ্র লোক নিকটে না থাকলে সেক্ষেত্রেই কেবল টাকা দিয়ে ফিতরা পরিশোধ করতে হবে।

নির্দৃষ্ট পরিমাপ করে নেয়া যেতে পারে

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। তাহলো রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জায়েদ ইবনে সাবিত (রা:) এর হাতের মাপকে ভারসাম্যপূর্ণ মাপ হিসাবে মুদের বিধান করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই নিয়মেই সবাই মুদ হিসাবে ফিতরা আদায়ের পাত্র তৈরি করে নিয়েছিলেন; যদিও মদিনাতে তখন প্রায় সবার-ই বিনিময়ের মাধ্যমের জন্য ‘মুদ’ এবং ‘সা’ এর বিধান প্রচলিত ছিল। যেমন আমাদের দেশে পল্লি এলাকায় এখনো কিছু কিছু ‘কাঠা’ র মাপ (এক সের) প্রচলিত আছে।

জায়েদ (রাঃ) নিশ্চয়ই-ই কোন খাট বা লম্বা লোক ছিলেন না। কারণ রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময়ই মধ্য  পন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন। যাচাই স্বরূপ একজন ৫’৬” থেকে ৫’৮” এর মধ্যে পুরুষ মানুষের দুই হাত একসাথে মিলিয়ে তার মধ্যে চাল পূর্ণ করেই দেখুন এক ‘মুদ’ এর পরিমাণ কতটুকু হয়। আর এভাবে চারবার দিলেই হয়ে গেল এক ‘সা’। আর এটাই হল সুন্নতের একনিষ্ঠ বিধান।  যদিও উত্তম বিষয়টি মহান আল্লহ রব্বুল আলামীনই ভাল জানেন, তারপরও এ বিষয়ে আরও অধিক জানার জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমে নীচের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন:

http://www.islam-qa.com/en/ref/1396/zakatul%20fitr

http://www.salafitalk.net/st/printthread.cfm?Forum=24&Topic=9559

 

You may also like...